সর্বশেষ

সারাদেশ

লোকসানে বন্ধ কুষ্টিয়া সুগার মিল, মরিচা ধরছে শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে

নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া
নুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া

বৃহস্পতিবার , ৭ মে, ২০২৬ ৮:২০ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়া সুগার মিলের যাত্রা শুরু হয় ১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর লাভজনক অবস্থানে থাকলেও নব্বই দশকের পর থেকে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।

দীর্ঘদিন লোকসানের বোঝা নিয়ে মিলটি সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা লোকসানের পর আনুষ্ঠানিকভাবে মিলের মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বন্ধ হওয়ার সময় মিলটির মোট পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬০৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। বর্তমানে চিনি উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও প্রতিষ্ঠানে এখনো ৭৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

মিলের মাড়াই কার্যক্রম চার বছর ধরে বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যত কোনো কাজ নেই। অধিকাংশ সময় তারা খোশগল্পে সময় কাটান এবং ইচ্ছামতো অফিসে আসা-যাওয়া করেন বলে জানা গেছে।

বর্তমানে মিলের একমাত্র সক্রিয় কার্যক্রম হচ্ছে ২২০ একর জমির কিছু অংশ ও পুকুর লিজ দেওয়া। এ খাত থেকে বছরে আয় হচ্ছে মাত্র ২৭ লাখ টাকা।

কুষ্টিয়া সুগার মিলে দীর্ঘদিন ধরে ২০২ শ্রমিক-কর্মচারীর প্রায় ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর থেকেই পাওনা অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।

অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস জানান, মিল বন্ধ হওয়ার সময় ২৬২ জনের প্রায় ২১ কোটি টাকা বকেয়া ছিল। ২০২৫ সাল পর্যন্ত আরও ১০০ শ্রমিকের প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা পাওনা জমেছে।

তিনি বলেন, অর্থসংকটের কারণে শ্রমিকরা চিকিৎসা করাতে পারছেন না। সন্তানদের পড়াশোনা এবং মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় কাজও ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত বকেয়া পরিশোধ ও মিল চালুর দাবি জানান তিনি।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মিলের প্রায় ১০০ কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রপাতি এখন অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হওয়ার পথে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রাংশে মরিচা ধরছে।

কুষ্টিয়া রেনউইক, যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হামিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। যথাসময়ে তেল-গ্রিজ দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করলে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

২০২১ সালের ৩ জুন মিলের গোডাউন থেকে রহস্যজনকভাবে ৫২ দশমিক ৭ টন চিনি গায়েব হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় স্টোরকিপার ফরিদুল হকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে।

মামলার অন্য দুই আসামি হলেন তৎকালীন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-আমীন এবং সর্দার বশির উদ্দিন। বন্ধ চিনিকলের গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ চিনি উধাও হওয়ার ঘটনা সে সময় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে।


মিল এলাকার কৃষকেরা ধীরে ধীরে আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সরকারিভাবে সরবরাহ করা বীজ উচ্চ ফলনশীল নয়। এছাড়া আখ চাষ করে ফসল ঘরে তুলতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগে, যেখানে অন্য ফসল বছরে তিনবার উৎপাদন করা সম্ভব।

আখ চাষি মনিরুজ্জামান আতু জানান, বর্তমানে মাত্র পাঁচজন চাষি মিলের প্রায় ২০ একর জমি লিজ নিয়ে আখ চাষ করছেন। নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের কারণে কৃষকেরা আখ চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, সরকারি প্রণোদনা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম এবং সেটিও সীমিতসংখ্যক চাষি পান। ফলে বিঘাপ্রতি ফলনও কম হচ্ছে।

কুষ্টিয়া সুগার মিল আধুনিকায়ন ও রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু মনি সাকলায়েন এলিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিল চালুর দাবিতে আন্দোলন চলছে। তিনি অবিলম্বে মিলটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তার মতে, আখ চাষের জন্য পর্যাপ্ত জমির সংকট রয়েছে। দীর্ঘ সময় লাগায় অনেক কৃষক আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরকারি প্রণোদনাও মিলছে না।

কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, বর্তমান সরকার মিলটি পুনরায় চালুর বিষয়ে আন্তরিক। তবে মিল চালু করতে হলে মাড়াই মৌসুমে ৬০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন আখ প্রয়োজন হবে।

তিনি বলেন, সনাতনী পদ্ধতিতে চাষ করলে বছরে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার মেট্রিক টন আখ উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষ করা গেলে মাত্র দুই হাজার একর জমি থেকেই বছরে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন আখ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

তার দাবি, চলতি বছর অনেক কৃষক উচ্চ ফলনশীল জাতের আখ চাষ শুরু করেছেন।

কুষ্টিয়া সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা আক্তার বলেন, কুষ্টিয়াসহ বন্ধ থাকা ছয়টি সুগার মিল কবে চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এছাড়া যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা পরীক্ষার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে মিল চালুর বিষয়ে তারা আশাবাদী।

চিনিকলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সাইফুল ইসলাম জানান, বন্ধ থাকা চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা জেনেছেন, সরকার এ বিষয়ে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন