ময়মনসিংহে পুকুর ভরাটের মহোৎসবে বিলীন ১৬০টি পুকুর
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ ৫:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
প্রশাসনের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে ময়মনসিংহ শহরে চলছে পুকুর ভরাটের মহোৎসব।
ইতোমধ্যে শহরের প্রায় ১৬০টি পুকুর ভরাট হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব পুকুর ভরাটের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, পুকুর ও জলাশয় ভরাটের এই প্রবণতা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে ময়মনসিংহ শহর। এসব জায়গায় তৈরি করা হচ্ছে বহুতল দালানকোঠা। শহরের আমলাপাড়া, শেওরামুন্সি বাড়ী, নন্দীপাড়া, কালীবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার বহু পুকুর ইতোমধ্যে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে ভরাট হয়ে গেছে।
জানা গেছে, সরকারি, অর্পিত সম্পত্তি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলিয়ে একসময় ময়মনসিংহ শহরে মোট ১৬৫টি পুকুর ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১৬০টি পুকুরই ইতোমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। এভাবে নির্বিচারে পুকুর ভরাটের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রভাবশালী মহল এসব পুকুর ভরাট করে দখলে নিচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি অবশিষ্ট পুকুরগুলো রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ভূমিকা না থাকায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
এদিকে ভরাট হওয়া পুকুর পুনরুদ্ধার এবং নতুন করে পুকুর ভরাট বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করছে ময়মনসিংহের বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন। জলাশয় সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ করে শহরের পুকুরগুলো পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসলেও বাস্তবে এখনো তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য, ময়মনসিংহ শহরের অনেক এলাকার নামকরণই হয়েছে পুকুরকে কেন্দ্র করে। যেমন—গোলপুকুর পাড়, তিনকোনা পুকুর পাড়, পচা পুকুর পাড় ইত্যাদি। অনেক পুকুরের অস্তিত্ব আজ আর নেই, তবে সেসব পুকুরের নামেই এখনো টিকে আছে এলাকার নাম।
জনউদ্যোগ ময়মনসিংহের আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, শহরে পুকুরের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এমনকি সরকারি জায়গায় থাকা পুকুরও ভরাটের নজির রয়েছে। একটি শহরে পুকুর থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা উপলব্ধি করছি না। সময়ের প্রয়োজনে পুকুর ভরাট করে দালানকোঠা গড়ে তোলা হচ্ছে। কিন্তু সেই ভবনে যদি আগুন লাগে, তখন আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি কোথা থেকে পাওয়া যাবে—সেই বিষয়টি কেউ ভাবছে না। তিনি বলেন, এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপদের মুখে পড়তে হবে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের জন্য পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন হয়। কোনো এলাকায় আগুন লাগলে পানির বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়। আশপাশে পুকুর থাকলে সেখান থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা যায়। কিন্তু কাছাকাছি পুকুর না থাকলে দূর থেকে পানি আনতে সময় বেশি লাগে, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মাজীদ জানান, শহরের অনেক পুকুর পরিষ্কার করা হচ্ছে। যেসব পুকুর রয়েছে সেগুলো পরিষ্কার রাখার জন্য সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। পুকুর ও এর আশপাশে ময়লা-আবর্জনা ফেললে পানিদূষণের পাশাপাশি দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ে। পুকুর সংরক্ষণে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান বলেন, কোন এলাকায় কত পরিমাণ পুকুর ভরাট হয়েছে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে ইতোমধ্যে বেদখল হওয়া শেরপুকুরটি উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে ভরাট অবস্থায় থাকা এ পুকুরটি পুনরায় খনন করা হবে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি জায়গায় থাকা কোনো পুকুর কেউ দখল বা ভরাটের চেষ্টা করলে দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ রক্ষা ও একটি সুন্দর নগরী গড়ে তোলার স্বার্থে ময়মনসিংহ শহরের অবশিষ্ট পুকুরগুলো ভরাটের হাত থেকে রক্ষা করে সংরক্ষণে প্রশাসন কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা ময়মনসিংহবাসীর।
১২৩ বার পড়া হয়েছে