মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাধাগ্রস্ত বাংলাদেশের ব্যবসা, অনিশ্চয়তার মুখে ব্যবসায়ী
বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬ ৮:৪৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া সংঘাত বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
সমুদ্রপথ কিংবা আকাশপথ-কোনো মাধ্যমে এখন পণ্য সরবরাহ কার্যকর হচ্ছে না। ফলে দেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য ও তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইরান গত সোমবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। দেশটির রেভোল্যুশনারি গার্ড ও নৌবাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে জাহাজে আগুন ধরা হবে। হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যচলাচল হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব দেশ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। একই সময়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য।
রপ্তানিতে প্রাথমিক অসুবিধা ও আর্থিক ঝুঁকি
রপ্তানিকারকরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা রপ্তানি করে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো বড় আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। কিছু কারখানা বন্ধের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "যুদ্ধের ব্যাপ্তি বড় আকার ধারণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে তা ছড়িয়ে পড়েছে। পণ্য আমদানি ও রপ্তানিতে প্রাথমিকভাবে অসুবিধা দেখা দিচ্ছে। তেল-গ্যাস সরবরাহও বিপদে পড়তে পারে।"
বিপিসির তথ্যানুযায়ী, দেশের জ্বালানির মজুত কেরোসিন বাদে দুই-চার সপ্তাহের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে। তাই বিকল্প উৎস থেকে তেল-গ্যাস আমদানি পরিকল্পনা জরুরি।
আটকা পড়া কনটেইনার ও শিপিং সমস্যার তীব্রতা
ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি কনটেইনার পরিবহনের বুকিং স্থগিত করে শিপিং লাইনগুলো। চট্টগ্রামের বেসরকারি ডিপো, চট্টগ্রাম বন্দর, শ্রীলঙ্কার কলম্বোসহ বিদেশের চার বন্দরে বিপুল সংখ্যক কনটেইনার আটকা পড়েছে। শিপিং কোম্পানিগুলোর ধারণা, আটকে পড়া কনটেইনারের সংখ্যা এক হাজারের বেশি। এতে খাদ্যপণ্য, পানীয় ও তৈরি পোশাক রয়েছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি)-এর বাংলাদেশের হেড অব অপারেশনস আজমীর হোসেন চৌধুরী বলেন, তাদের প্রায় ২৫০ কনটেইনার আটকা পড়েছে। নতুন বুকিং নেওয়া হচ্ছে না।
হিমায়িত মাছ রপ্তানি করা রিভেরাইন ফিশ অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ-এর এমডি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী জানান, অন্তত শতাধিক কনটেইনার বন্দরে ও কারখানায় আটকা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ গত বছর ৫৪ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার ৩০-৩৫ শতাংশ গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধের কারণে তাদের কয়েকটি পণ্য বন্দরে আটকা পড়েছে। এছাড়া কাঁচামাল, বিশেষ করে প্লাস্টিক তৈরির পেট্রোকেমিক্যালও না আসায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে পণ্য
চট্টগ্রামের ডিপোতে আটকা পড়া কনটেইনার থেকে পণ্য সরিয়ে রাখা হচ্ছে। টি কে গ্রুপ, হিফস অ্যাগ্রো ও চিটাগং এশিয়ান অ্যাপারেলস-এর মতো প্রতিষ্ঠানও একই সমস্যার মুখোমুখি। নতুন ক্রয় আদেশ স্থগিত, যা ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, "সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেবে। এলএনজি ও তেলের মজুত থাকলেও নতুন আমদানি না হলে তা দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি বাড়বে। সরকারের দ্রুত ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা উচিত।"
১২৪ বার পড়া হয়েছে