যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান যে অস্ত্র ব্যবহার করছে
সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬ ৭:১৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করার পর পাল্টা জবাব হিসেবে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন শুরু করেছে ইরান। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার খবর প্রকাশের পর তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—এ হামলার জবাব কেবল সীমিত আকারে নয়, বরং বিস্তৃত সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবেই দেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারগুলোর একটি রয়েছে ইরানের হাতে। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়। ফলে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এর আওতায় পড়ে। স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার—যেগুলো দ্রুত ও একযোগে হামলার জন্য উপযোগী।
স্বল্পপাল্লার অস্ত্রভাণ্ডারে রয়েছে ফাতেহ সিরিজের বিভিন্ন সংস্করণ, জলফাগর, কিয়াম-১ ও শাহাব-১/২। মাঝারি পাল্লায় শাহাব-৩, এমাদ, ঘাদর-১, খোররামশাহর ও সেজিল সিরিজ উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে খেইবার শেকান ও হাজ কাসেম ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হওয়ায় এ সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে তেহরান।
ইরানের আরেকটি বড় শক্তি তাদের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা কম উচ্চতায় উড়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে। সুমার, ইয়াআলি, কুদস, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’আদ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র ভূমি ও নৌ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে সুমার প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে বলে দাবি।
ড্রোন ব্যবহারে ইরান গত কয়েক বছরে বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে। একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন একসঙ্গে বিপুল সংখ্যায় পাঠিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার কৌশল এখন তেহরানের সামরিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধীরগতির হলেও কম খরচে ব্যাপক ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে ড্রোন বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান দেশজুড়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, সুরক্ষিত উৎক্ষেপণকেন্দ্র ও লুকানো ঘাঁটির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এতে শত্রুপক্ষের পক্ষে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে টিকে থাকার জন্য এ অবকাঠামোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভূমি ও আকাশের বাইরে সমুদ্রপথও ইরানের কৌশলের অংশ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ব তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। সরাসরি অবরোধ ঘোষণা ছাড়াই রেডিও সতর্কবার্তা, নৌ টহল, জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন ও ড্রোন মোতায়েনের মাধ্যমে এ রুটে অস্থিরতা সৃষ্টি সম্ভব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড ইতিমধ্যে একাধিক তেলবাহী জাহাজে হামলার দাবি করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা ও বিমা ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তেহরান সম্প্রতি ‘ফাত্তাহ’ নামে একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রদর্শন করেছে। ইরানের দাবি, এটি অত্যন্ত উচ্চগতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য সীমিত।
ইরানি কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, দেশটির ভূখণ্ডে বড় ধরনের হামলা হলে তা সীমিত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, একবারে বড় আঘাতের বদলে ধারাবাহিক ও বহুস্তরীয় অভিযানের মাধ্যমে চাপ ধরে রাখার কৌশলই নিতে পারে তেহরান।
১০৬ বার পড়া হয়েছে