নির্বাচনী প্রচারে ডিজিটালের আধিপত্য, পোস্টারবিহীন প্রচারে শীর্ষে ফেসবুক
শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৩:৫১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নির্বাচন এলেই একসময় শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই চোখে পড়ত পোস্টারের ছড়াছড়ি। দেয়াল, খুঁটি, দড়ি—কোথাও ফাঁকা জায়গা থাকত না। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই পরিচিত চিত্র আর দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশনায় এবার রঙিন ও সাদাকালো—সব ধরনের পোস্টারই নিষিদ্ধ। কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে পোস্টার দেখা গেলেও তা আগের মতো ব্যাপক নয়।
এর পরিবর্তে এবার নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক হয়ে উঠেছে প্রচারের প্রধান প্ল্যাটফর্ম। পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমেও সক্রিয় প্রার্থীরা।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, পোস্টার নিষিদ্ধের পাশাপাশি প্রচারণার ধরনেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপ্রধান আমিনুল এহসান বলেন, এবারের নির্বাচনে মাইকিং আগের তুলনায় কম চোখে পড়ছে। বরং প্রার্থীদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। শহর এলাকায় কিছু বিলবোর্ড দেখা গেলেও গ্রামাঞ্চলে এর ব্যবহার তুলনামূলক কম। অনলাইনে ফেসবুকই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্রচারমাধ্যম।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, আগে দেয়ালজুড়ে পোস্টার লাগানো হতো, পরে লেমিনেটিং করা পোস্টার ঝুলত। এবার সেই চর্চা নেই। প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণার সুযোগ এখন অনেক বিস্তৃত।
এবার প্রথমবারের মতো পোস্টারের বিকল্প হিসেবে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে ইসি। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার প্রতিটির আয়তন ৯ ফুট বাই ১৬ ফুট। তবে বিলবোর্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, অনেক প্রার্থী মানসম্মত বিলবোর্ড না বানিয়ে বাঁশ-কাঠের দুর্বল কাঠামো ব্যবহার করছেন। এতে প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু প্রার্থী এলইডি সাইন ব্যবহারের দিকেও ঝুঁকছেন।
ঢাকা-৪ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান বলেন, পোস্টার না থাকায় পরিবেশ উপকৃত হয়েছে। তবে বিত্তশালী প্রার্থীরা ডিজিটাল ও অন্যান্য মাধ্যমে ব্যয়বহুল প্রচারণা চালাতে পারছেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে অডিও বার্তা পাঠাচ্ছেন, যা সব প্রার্থীর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি ব্যানারের ব্যবহার বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করেন।
ইসির পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক জানান, নির্বাচনী প্রচারণাকে আরও ইতিবাচক ও নিয়ন্ত্রিত করতে কমিশন কাজ করছে।
পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন—লাইক, শেয়ার, মন্তব্য বা সমালোচনার মাধ্যমে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ও কেবল টিভিতে দলীয় বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। কিছু প্রার্থী মোবাইল ফোনে শুভেচ্ছা বার্তাও পাঠাচ্ছেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবার তুলনামূলক কম। এক প্রার্থীর প্রচারণার ওপর অন্য প্রার্থীর ব্যানার বা বিলবোর্ড বসানোর ঘটনাও খুব একটা দেখা যায়নি। তবে হ্যান্ডবিলের ব্যবহার বেড়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, একক জনসভায় তিনটির বেশি মাইক বা লাউড স্পিকার ব্যবহারের সুযোগ নেই। বাস্তবেও এবার মাইকিং আগের তুলনায় কম। পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা সারোয়ার হোসেন বলেন, আগের নির্বাচনে শব্দদূষণ ছিল অসহনীয়। এবার হ্যান্ডমাইক ব্যবহারের কারণে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত।
পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় নিজেকে ভোটারের কাছে পরিচিত করতে প্রার্থীরা ঘরে ঘরে যাচ্ছেন বেশি। বিশেষ করে তরুণ প্রার্থীরা এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে বড় দলের অভিজ্ঞ প্রার্থীরাও মাঠে নামছেন। নারীকর্মীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। যদিও কোথাও কোথাও মোবাইল ব্যাংকিং ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে।
পোস্টারের জায়গা দখল করেছে ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেট। প্রার্থীরা ক্ষমতায় গেলে কী করবেন—সে বিষয়গুলো তুলে ধরে হ্যান্ডবিল ভোটারদের হাতে দিচ্ছেন।
একসময় নির্বাচনী মৌসুমে চায়ের দোকানগুলো ছিল রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র। এবার রাজধানীতে সেই দৃশ্য অনেকটাই অনুপস্থিত। পশ্চিম আগারগাঁওয়ের চা বিক্রেতা রুস্তম আলী বলেন, মানুষ এখন ব্যস্ত। রাজনীতির চেয়ে বেশি আলোচনা হয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে।
১২০ বার পড়া হয়েছে