জামায়াত কি বদলাচ্ছে, নাকি বদলানোর ভান করছে?
বৃহস্পতিবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২:০৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে যে প্রচলিত ধারণা—এটা মূলত ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের রাজনীতি করে—সেটা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে দলটি নিজেকে ইসলামের নামেই রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে, সংগঠন থেকে ছাত্রশিবির, মসজিদ–মাদরাসা–কেন্দ্রিক নেটওয়ার্ক—সবখানেই তাদের পরিচয় “ইসলামি আন্দোলন” হিসেবে গড়ে উঠেছে।
কিন্তু ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত তাদের নতুন ইশতেহার ও ‘নীতি–ঘোষণা’ পড়ে অনেকেরই মনে হয়েছে: দলের রাজনীতির মূল বিষয়বস্তু যেহেতু ইসলাম, সেখানে নির্বাচনী ডকুমেন্টে ইসলাম এতটা ‘ইনডাইরেক্ট’ কেন?
ইশতেহারের ভাষা দেখলে প্রথমেই চোখে পড়ে—এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে অর্থনীতি, কল্যাণ, সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্নীতি দমন, গুড গভর্ন্যান্স, তরুণদের কর্মসংস্থান, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মতো এজেন্ডা। লেখা হয়েছে স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড, সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ, ভ্যাট কমানো, স্বাস্থ্য–শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো, প্রশাসনিক সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি। রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—সবখানে আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ভাষা। ইসলাম এখানে এসেছে মূলত “ন্যায়ভিত্তিক সমাজ”, “নৈতিক রাষ্ট্র”, “সুদমুক্ত অর্থনীতি”, “ধর্মীয় স্বাধীনতা”—এসব সাধারণ ও আপাত–সেফ শব্দগুচ্ছের ভেতরে। ফল, যারা কট্টর ইসলামি ‘শরিয়াহ স্টেট’–ধর্মী কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা খুঁজছেন, তাদের কাছে ইশতেহার অনেকটাই ডিপ্লোম্যাটিক কিংবা ‘নরম’ মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এখানেই আসছে মূল প্রশ্ন—জামায়াত কি বাস্তবতা বুঝে সত্যিকারের আদর্শিক পুনর্বিন্যাস করেছে, নাকি কেবল ভোটার আর আন্তর্জাতিক অডিয়েন্সের ‘মাইন্ড রিড’ করে ভাষা পাল্টেছে? দলের অতীত অবস্থান, যুদ্ধাপরাধ–বিতর্কে ভূমিকা, নারীর অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কিংবা শরিয়াহ–ভিত্তিক আইন নিয়ে তাদের পুরোনো বক্তৃতা ও সাহিত্য ঘেঁটে দেখলে বোঝা যায়, কট্টর ইসলামি রাষ্ট্র–মডেলের প্রতি আনুগত্য একসময় ছিল তাদের রাজনীতির কেন্দ্রে। সেই ধারার সঙ্গে বর্তমান ইশতেহারের ফারাক এতটাই স্পষ্ট যে, সন্দেহ জাগা অস্বাভাবিক নয়—এটা কি কেবল নির্বাচনী ‘রিব্র্যান্ডিং’?
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু বক্তব্য ও কার্যক্রম ইঙ্গিত দিচ্ছে ভিন্ন এক স্ট্র্যাটেজিক পথে। জামায়াতের শীর্ষ নেতারা দেশি–বিদেশি প্ল্যাটফর্মে বলছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেবেন না; বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতর থেকে ন্যায়, সুশাসন ও কল্যাণের রাজনীতি করতে চান। নতুন প্রজন্ম, শহুরে শিক্ষিত শ্রেণি ও আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করার জন্য তাদের এই “নরম ভাষা”কে অনেকে দেখছেন বাস্তবতার প্রতি বাধ্য–স্বীকৃতি হিসেবে। কেউ কেউ বিশ্লেষণ করছেন—এটা হয়তো একধরনের “Islamist Left”–মুখী রূপান্তর; যেখানে ইসলাম থাকবে মূল্যবোধের ফ্রেম হিসেবে, কিন্তু নীতিগত অগ্রাধিকারে আসবে অর্থনৈতিক ন্যায়, সামাজিক সমতা আর মানবাধিকার।
তবে নিজ ঘরের ভেতর থেকেই এর বিপরীত পাঠও ভেসে আসছে। কিছু ইসলামি গোষ্ঠী ইতোমধ্যে অভিযোগ তুলেছে—জামায়াত ক্ষমতার রাজনীতির জন্য শরিয়াহ–কেন্দ্রিক স্পষ্ট অবস্থান থেকে সরে এসেছে, ইশতেহারে আদর্শিক ধারার উল্লেখযোগ্য অংশকে আড়াল করেছে। একই সঙ্গে মাঠের অনেক বক্তৃতায় এখনও “ইসলামই সমাধান”, “ইসলামী সমাজব্যবস্থা”–ধরনের পুরোনো স্লোগান অপরিবর্তিত আছে, অথচ লিখিত ইশতেহারে সেই ভাষা নেই বা মারাত্মকভাবে নরম। ফলে দ্বৈত ন্যারেটিভের একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে—একটা ভাষা আন্তর্জাতিক/শহুরে ভোটারের জন্য, আরেকটা কোর–ক্যাডার ও ধর্মভিত্তিক সমর্থকদের জন্য।
সব মিলিয়ে চিত্রটা দাঁড়াচ্ছে এভাবে: জামায়াতের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে এখনও ইসলামই আছে, কিন্তু নির্বাচনী ইশতেহারে সেটাকে সামনে না এনে, পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড–ভ্যালুতে রেখে দেয়া হয়েছে। “ইসলামের কট্টর রীতিনীতি নিয়ে জামায়াতের শক্ত অবস্থান”—এটা তাদের অতীত ও আদর্শিক দলিলপত্রে স্পষ্ট; বর্তমান ইশতেহারে সেই ধারার কোনো সরাসরি প্রতিফলন না থাকায় অনেক ভোটারের মনে সন্দেহ জন্মাচ্ছে—এই লেখা কি তাদের ‘আসল কথা’, নাকি নির্বাচনের আগে লেখা একটি ‘সেফ কপি’?
এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কিন্তু সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়—জামায়াতের নতুন ইশতেহার বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের সিগন্যাল বয়ে এনেছে। এটা সত্যিকারের আদর্শিক রূপান্তর, নাকি কেবল ভোট–ও আন্তর্জাতিক চাপ বিবেচনায় কৌশলী ভাষা—সেটা ভবিষ্যতের বাস্তব প্রয়োগই প্রমাণ করবে। আপাতত ভোটারের কোর্টেই প্রশ্নটা খোলা রইল: লিখিত ইশতেহার আর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস—তাদের বিশ্বাসের পাল্লায় কোনটা বেশি ভারী?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১৪৭ বার পড়া হয়েছে