প্রচারের শুরুতেই উত্তেজনা, মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত
শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ৩:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
প্রায় সাড়ে ১৬ বছর পর একটি প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে দেশ। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। তবে প্রচারের শুরুতেই এই দুই শিবিরের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার ইঙ্গিত মিলেছে।
নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দুই দিনেই বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ধারা আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে।
৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে—এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল। প্রচারের শুরুতেই সেই ধারণা বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, ধর্মের অপব্যবহার এবং নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে।
গত দুই দিনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে আটটি জনসভায় বক্তব্য দেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও রংপুরে পাঁচটি জনসভায় বক্তব্য রাখেন। দুই নেতার বক্তব্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাদের বিপরীতমুখী রাজনৈতিক অবস্থান।
তারেক রহমান জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে ১৯৭১ সালে দলটির স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি ধর্মকে ব্যবহার করে ‘বেহেশতের টিকিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে ‘শিরক’ ও ‘কুফরি’ আখ্যা দেন। পাশাপাশি নির্বাচনকে ঘিরে পোস্টাল ব্যালট ছিনতাই, এনআইডি ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহের মাধ্যমে ভোট কারচুপির আশঙ্কার কথা তুলে ধরে সতর্ক করেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নির্বাচনকে ‘দ্বীন কায়েমের নিয়মতান্ত্রিক জিহাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আগে যুদ্ধ হতো অস্ত্র দিয়ে, এখন যুদ্ধ হচ্ছে ব্যালট দিয়ে। তারেক রহমানের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাফের বলতে পারেন না।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে অতীত দুর্নীতি, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগের পাশাপাশি ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’ হয়ে ওঠার অভিযোগও তোলা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুই পক্ষই ‘বিদেশি আধিপত্য’ ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিএনপি জামায়াতকে পাকিস্তানের প্রভাবাধীন হিসেবে তুলে ধরছে, আর জামায়াত বিএনপির বিরুদ্ধে ভারতের আধিপত্যের অভিযোগ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব উল্লাহ বলেন, এগুলো মূলত দলগুলোর রাজনৈতিক ও আদর্শগত অবস্থানের প্রকাশ। তবে এসব ইস্যু ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হলে তা উদ্বেগজনক হবে। তাঁর মতে, দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক নির্বাচন নিশ্চিত করা।
প্রচারে উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির দিকেও নজর দিচ্ছে বিএনপি। তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’, খাল খনন ও বেকারদের প্রশিক্ষণের মতো প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জনসভায় সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ তৈরির চেষ্টা করছেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে একটি অভিনব কৌশল।
অন্যদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে ‘খয়রাতি অনুদান’ বলে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, জামায়াত কোনো কার্ডে নয়, জনগণের ভালোবাসার ওপর রাজনীতি করতে চায়। তিনি নির্বাচনকে ‘গণভোট’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রচারের আগের দিনগুলোতে জামায়াতের নারী কর্মীদের এনআইডি সংগ্রহের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। মিরপুরে জামায়াত আমির এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ভিন্নমতের প্রতি তীব্র আক্রমণ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুরোনো বৈশিষ্ট্য। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবার সেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী প্রচারের প্রথম দুই দিনেই স্পষ্ট হয়েছে, ভোটের মূল লড়াই এবার এই দুই বিরোধী শিবিরের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মের ব্যবহার, বিদেশি প্রভাব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক আদর্শ—এই ইস্যুগুলোকে ঘিরেই আগামী দিনে ভোটের মাঠ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
১৩৫ বার পড়া হয়েছে