কটিয়াদীর ঢাকের হাটে ঐতিহ্যবাহী সুরের লড়াই, লাখ টাকার দরদাম
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:১০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঢাকের গর্জন, সানাইয়ের সুর আর কাঁশির মূর্ছনায় মুখর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী। দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রায় পাঁচশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে জড়ো হয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দুই শতাধিক বাদকদল। এখানে ঢাক-ঢোল বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় না কোনো বাদ্যযন্ত্রও। বরং বাদ্যের তালে তালে চলে দক্ষতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। আর সেই সুরে মুগ্ধ হয়ে পূজা আয়োজকেরা পছন্দের দলকে ভাড়া করেন। কোথাও ৬০ হাজার, কোথাও ৭৮ হাজার, আবার কোনো দলের দর হাঁকা হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
দুর্গাপূজার আয়োজন মানেই ঢাকের বাদ্য, সানাইয়ের সুর আর উৎসবের আমেজ। ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ আর কাঁশি-সানাইয়ের মূর্ছনা ছাড়া যেন পূজার আনন্দই ঠিক জমে না। সেই চিরচেনা সুরের টানে প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। প্রায় পাঁচশ বছরের পুরোনো এই হাট এখন বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন ছাড়িয়ে পরিণত হয়েছে লোকজ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির মিলনমেলায়।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থেকে জমতে শুরু করা এ হাট চলবে শুক্রবার ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাক-ঢোল, কাঁশি-সানাই, করতাল ও বাঁশির শব্দে মুখর পুরো এলাকা। একেকটি বাদকদল নিজেদের সুর ও দক্ষতা দিয়ে নজর কাড়ার চেষ্টা করছে। কার বাজনা বেশি জমজমাট, কার তালে রয়েছে বাড়তি আকর্ষণ—এ যেন সুরের এক নীরব প্রতিযোগিতা।
বাদকেরা বাজনা বাজিয়ে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরছেন, আর পূজা আয়োজকেরা ঘুরে ঘুরে শুনছেন বিভিন্ন দলের পরিবেশনা। পছন্দ হলে শুরু হচ্ছে দরদাম। আলোচনা শেষে দুই পক্ষের সম্মতিতে চুক্তি হচ্ছে। অর্থাৎ, এখানে শুধু বাদ্যের তালে মন মাতালেই চলে না, চুক্তির অঙ্কেও মিলতে হয় দুই পক্ষের হিসাব।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা থেকে ঢাকের হাটে এসেছেন পূজা আয়োজক বিমল চন্দ্র পাল। প্রতিবছর দুর্গাপূজার জন্য বাদকদল নিতে এই হাটে আসেন তিনি।
বিমল চন্দ্র পাল বলেন, সকাল থেকে বিভিন্ন দলের বাজনা শুনেছেন। এর মধ্যে একটি দলের পরিবেশনা তাঁর ভালো লেগেছে। পরে তাঁদের সঙ্গে ৬০ হাজার টাকায় চুক্তি করেছেন।
গাজীপুরের টঙ্গী থেকে আসা শ্যামল পণ্ডিতের এবারই প্রথম এই হাটে আসা। প্রথমবার এসেই হাটের পরিবেশে মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। বিভিন্ন দলের বাজনা শোনার পর বিক্রমপুরের পাঁচ সদস্যের একটি বাদকদল পছন্দ করেছেন। তাঁদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ৭৮ হাজার টাকায়।
অন্যদিকে, বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি পরিমল দাসের কাছে এই হাটের আকর্ষণ শুধু কাজ পাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করা এবং সবার সঙ্গে মিলেমিশে বাদ্য বাজানোর আনন্দও তাঁকে টানে।
পরিমল দাস বলেন, ফোনে অনেকেই যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু তিনি হাটে আসেননি এমনটা হয় না। এখানে না এলে মন মানে না। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, আনন্দও আলাদা। তিনি ৩০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক চেয়েছেন। দরদাম চলছে, কমবেশি করে চুক্তি হলে বাড়ি ফিরবেন।
কুমিল্লা থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন কাজল মণিঋষি। তাঁদের দলে ঢাকের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও। দলটির জন্য তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক চাইছেন। আগ্রহী আয়োজকেরা দরদাম করলেও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট।
কাজল মণিঋষি বলেন, লাখ টাকার কম হলে তিনি বাজাতে যাবেন না।
নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক-ঢোল কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। মূলত পূজার মণ্ডপে বাজানোর জন্য বাদকদল নির্বাচন ও ভাড়া করার জায়গা এটি। আয়োজকেরা দলগুলোর পরিবেশনা শুনে দক্ষতা যাচাই করেন। এরপর সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও দলের পারদর্শিতা বিবেচনায় পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়।
এবারের হাটে বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদকদল এসেছে। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি রয়েছে বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনি ও আধুনিক নানা বাদ্যযন্ত্র।
বাদ্যের সুরে আকৃষ্ট হয়ে হাটে ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নন, অন্য ধর্মের মানুষেরাও আসছেন এই আয়োজন দেখতে ও শুনতে। তাঁদের কাছে এটি কেবল পূজার বাদকদল বাছাইয়ের জায়গা নয়, বরং স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক পরিচিত ঠিকানা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ঢাক-ঢোলের শব্দ আর সানাইয়ের সুরে হাটের পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকার মানুষের মিলন এবং বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা দেখতে প্রতিবছরই এখানে লোকজনের সমাগম ঘটে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ এই হাটের তত্ত্বাবধান করছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় কটিয়াদীর ঢাকের হাটের সূচনা হয়।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, রাজপ্রাসাদে পূজার জন্য সেরা ঢাকির সন্ধানে বিক্রমপুরে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। সেই খবর পেয়ে সেখান থেকে অনেক ঢাকি নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাঁদের বাজনা শুনে সেরা দল নির্বাচন করেন। সেই আয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ঢাকের হাটের ঐতিহ্য।
জীবন কুমার সাহা আরও বলেন, হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে সংগঠনটি। কোনো বাদকদল ভাড়ায় যাওয়ার সুযোগ না পেলেও তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে কটিয়াদীর এই ঢাকের হাট এখন দুর্গাপূজার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যেমন চলে সুরের প্রতিযোগিতা, তেমনি গড়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ। ঢাকের তালে, সানাইয়ের সুরে আর দরদামের ব্যস্ততায় পুরান বাজার যেন কয়েক দিনের জন্য হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মঞ্চ।
১৪৫ বার পড়া হয়েছে