নাটোরে শিক্ষক সংকট: প্রাথমিক শিক্ষার মান নিম্নগামী
সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ ৯:১৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নাটোর জেলা ব্যাপী জনবল সংকটে দীর্ঘদিন থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার মান নিম্নগামী। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
পাশাপাশি অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। তবে শিক্ষা বিভাগ বলছে, বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। শিঘ্রই সংকট কাটাতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, নাটোর জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৩৫টি। এছাড়া রয়েছে ২টি শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। জেলার ৭৩৫টি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন ৪ হাজার ১শ ২২ জন সহকারী শিক্ষক। এরমধ্যে পদ শূন্য রয়েছে ২৯২টি। এছাড়া জেলায় মোট ৩৩টি সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (এইউপিইও) পদ থাকলেও শূন্যবিল রয়েছে ১১টি। এর বাইরে জেলায় কোথাও রাজস্ব খাতের পিয়ন নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পিয়নের কাজ চলছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাগাতিপাড়া উপজেলার মালঞ্চি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমনই চিত্র দেখা যায়। এছাড়া অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়েই সহকারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের সংকট রয়েছে। প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ থাকায় অধিকাংশ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করায় শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকলেও সহকারী শিক্ষক বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে থাকার কারণে শিক্ষক স্বল্পতায় শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা।
নাটোর সদর উপজেলার রহিম কুঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কমিটির দাতা সদস্য জনাব মোঃ বাবলুর রহমান জানান, অত্র বিদ্যালয়ের দুইজন সহকারী শিক্ষক জনাবা মোছা: মিনা সুলতানা ও জনাবা মোছা: কহিনুর ফেরদৌস গত ২০২৪ সালের ৩১ মে অধিদপ্তর থেকে ডেপুটেশন নিয়ে সদরের চৌকিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অদ্যাবধি অবস্থান করছেন। এই পরিস্থিতিতে সাতজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করা খুবই কষ্টসাধ্য এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেপুটেশনের কারণে বিদ্যালয়ে নতুন শিক্ষক নিয়োগে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে রহিম কুঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৪শত শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা প্রদান ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জুনাইদ জানান, তাদের স্কুলে শিক্ষক কম ও শিক্ষার্থী বেশি। হেডম্যাম বা অন্য কোন শিক্ষক ছুটিতে থাকলে মাঝে মাঝে একই শিক্ষক দ্বারা দুইটি ক্লাস হয়। তখন শিক্ষকেরা ক্লাস ভালো করে নিতে পারেন না। আবার স্কুলে বেঞ্চ ও ভবন কম থাকায় গাদাগাদি করে বসতে হয়। এতে ভালো পড়াশোনা হচ্ছে না।
জুনাইদের বাবা জাকির হোসেন জানান, তিনি নিজেও এই স্কুলেই পড়াশোনা করেছেন। আগে পড়ালেখা অনেক ভালো ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষক স্বল্পতায় ক্লাস ভালো হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, রহিম কুঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নাটোর সদরের একটি স্বনামধন্য স্কুল ছিল। কিন্তু দুই-তিন বছর যাবৎ শিক্ষক স্বল্পতা হেতু বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে।
স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী ইউনুস আলী জানান, তাদের সময় স্কুলের পড়াশোনার যে মান ছিল, এখন তা নেই। শিক্ষক সংকট না কাটলে দিন দিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।
বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য বাবলুর রহমান জানান, শিক্ষক সংকটের সমাধানে প্রধান শিক্ষক বারবার চেষ্টা করলেও সমাধান আসছে না। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর ক্ষুব্ধ হচ্ছেন অভিভাবকরাও।
বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এই বিদ্যালয়ে ৪০০ এর অধিক শিক্ষার্থী আছে। প্রাক-প্রাথমিক ছাড়াও ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত সাতজন শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে বাইরে গেলে অন্য শিক্ষকদের অনেক কষ্ট হয়। স্কুলে আগে শিক্ষক ঠিক থাকলেও ডেপুটেশনে দুইজন শিক্ষক চলে যাওয়ায় বর্তমানে অনেক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। শিক্ষক সংকট নিরসনে শিক্ষা অফিসকে বারবার জানালেও কোন ফল আসছে না, ফলে তারা নিদারুণ কষ্টে ক্লাস চালাচ্ছেন।
সরেজমিনে খোঁজ নেওয়া যায়, নাটোর সদরের চৌকিরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা (ডেপুটেশনের দুইজন শিক্ষকসহ) মোট ৮ জন, কিন্তু সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৯০ জন প্রায়। ডেপুটেশনের বিধি মোতাবেক এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর শিক্ষকগণ নিজ বিদ্যালয়ে ফেরত যাওয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হয়েছে, এবং স্ব-বিদ্যালয়ে ফেরত যাননি বা ডেপুটেশন বাতিল হয়নি।
ডেপুটেশন প্রাপ্ত মিনা সুলতানা ও কহিনুর ফেরদৌস অন্যত্র বদলি হয়ে গেলে শূন্য পদে রহিম কুঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন নিয়োগে দুইজন শিক্ষক পাবেন, যাতে শিক্ষক সংকট দূর হয় ও শিক্ষার্থীরা কাঙ্খিত শিক্ষা গ্রহণের পথ সুগম হবে বলে মনে করছেন স্কুলের অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল হান্নান জানান, জেলায় ২৯২ জন শিক্ষক সংকট পূরণের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যেই ২০৬ জন শিক্ষকের নিয়োগে ভাইভা সম্পন্ন হয়েছে। কিছু দিনের মধ্যেই তাদের পদায়ন হলে সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। এর বাইরে রাজস্ব খাত থেকে পিয়ন নিয়োগের পাশাপাশি ১১ জন এইউপিইও এর নিয়োগে কাজ চলছে। তবে বিধি বহির্ভূতভাবে দীর্ঘদিন ডেপুটেশন থাকা মিনা সুলতানা ও কহিনুর ফেরদৌস সম্পর্কে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
১১৮ বার পড়া হয়েছে