হাদির আসামি গ্রেফতার: ভুয়া দুবাই–কাহিনি ভারতীয় মিডিয়ার উন্মোচন
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ ৬:৪৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদকে ভারতে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ।
বনগাঁ সীমান্ত এলাকার কাছ থেকে ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে আটক করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ), যা নিশ্চিত করেছে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইসহ একাধিক গণমাধ্যম। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চালানো “ফয়সাল দুবাইয়ে” প্রচারণা এবং তা ঘিরে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমের বিতর্কিত ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
পালিয়ে যাওয়ার কাহিনি: পুলিশের ব্রিফিং বনাম ভারতীয় বয়ান
ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক ব্রিফিংয়ে শুরু থেকেই বলা হয়, ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয় হয়ে পালিয়ে যায়। ডিএমপির কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানান, হত্যাকাণ্ড পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং ঘটনার পরপরই ফয়সালকে সীমান্ত পার করাতে সহায়তা করে একটি চক্র, যাদের মধ্যে ভারতীয় মেঘালয় সীমান্ত এলাকায় পূর্তি ও সামি নামের দুই সহযোগীকেও আটক করা হয়। এই বর্ণনা অনুযায়ী, ফয়সালের প্রথম গন্তব্য ছিল ভারত, দুবাই নয়—এটা পুলিশি তথ্যে বারবার উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, ভারতের কিছু টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তখন প্রশ্ন তোলে, ফয়সাল আদৌ ভারতে আছে কি না, এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যকে সন্দেহের চোখে উপস্থাপন করে। এতে করে একদিকে বাংলাদেশের তদন্ত সংস্থার বর্ণনা, অন্যদিকে ভারতীয় অংশের সংশয়—দুই ধরনের বয়ানই একসঙ্গে ঘুরতে থাকে মিডিয়া–পরিসরে।
দুবাই ভিডিও, ‘গদি’ মিডিয়া ও মিথ্যা ন্যারেটিভ
এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশ পায় একটি ভিডিও, যেখানে নিজেকে হাদি হত্যা মামলার মূল আসামি বলে পরিচয় দিয়ে একজন ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকেই ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন। ওই ভিডিওতে তিনি হত্যাকাণ্ডের পেছনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রের কথা বলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি তোলেন, যা পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম—বিশেষ করে ডানপন্থী–ঝোঁকযুক্ত টিভি চ্যানেলগুলো—এই ভিডিওকে প্রায় যাচাই–বাছাই ছাড়াই প্রচার করে “ফয়সাল দুবাইয়ে”, “বাংলাদেশি পুলিশের দাবির বিপরীতে আসামি আরব দেশে” শিরোনামে প্রচারণা চালায়। এতে বাস্তব তদন্তকে আড়াল করে একটি বিকল্প ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হয়, যেখানে ভারতের মাটিতে আসামি থাকার অভিযোগকে দুর্বল দেখানোর চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল এক ধরনের কাভার–আপ প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ছিল ভারতের ভূখণ্ডকে এড়িয়ে গিয়ে পুরো বিষয়টিকে মধ্যপ্রাচ্য–ভিত্তিক পালানোর গল্প হিসেবে দাঁড় করানো।
কূটনৈতিক স্থবিরতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সীমাবদ্ধতা
হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফয়সালকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে খুব বেশি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য ও গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে আসে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারত সরকারের সঙ্গে কার্যকর লিয়াজোঁ, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা ও আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত চালানোর ক্ষেত্রে স্পষ্ট ঘাটতি ছিল।
ডিএমপির ব্রিফিংয়ে একদিকে বলা হচ্ছিল, মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল ও তার চালক ভারতে পালিয়ে আছে; অন্যদিকে ভারতের কিছু “গদি মিডিয়া” তাকে দুবাইয়ে দেখিয়ে পুরো ইস্যুটাকে ঘোলাটে করে তোলায়, কূটনৈতিক চাপও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ফয়সালকে ভারতে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কাজে যে যৌথ উদ্যোগ দরকার ছিল, তা পর্যাপ্ত গতিতে এগোয়নি—এই অভিযোগ তুলছেন কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা–বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ।
নতুন সরকারের কূটনৈতিক চাপ ও বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তার
এদিকে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের অধীনে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ছবিটা পাল্টাতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স জানিয়েছে, নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বনগাঁ সীমান্ত এলাকার আশপাশে অভিযান চালিয়ে রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং আলমগীর হোসেন (৩৪) নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশে চাঁদাবাজি ও খুন মামলায় জড়িত থাকার বিষয়টি এসটিএফের বিবৃতিতেই উল্লেখ আছে।
এএনআই ও কলকাতা–ভিত্তিক একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুজনই হাদি হত্যা মামলার আসামি এবং বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন—এমন গোয়েন্দা তথ্যের পরই এসটিএফ অভিযান চালায়। বাংলাদেশের পুলিশ সূত্রও নিশ্চিত করেছে, গ্রেপ্তারের খবরে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত পাঠানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে, একদিকে যেমন বহু প্রতীক্ষিত গ্রেপ্তার ঘটল, অন্যদিকে “ফয়সাল ভারতে নেই” বা “দুবাইয়ে আছে”–জাতীয় সব প্রচারণাই কার্যত ভেঙে পড়ল।
ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচার ও আঞ্চলিক রাজনীতির বার্তা
ফয়সালের বনগাঁ থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তা স্পষ্ট হয়েছে যে, আগে প্রচারিত “দুবাই ভিডিও”–কেন্দ্রিক ন্যারেটিভ ভারতীয় কিছু গণমাধ্যম সচেতনভাবেই জোর দিয়ে সামনে এনেছিল। বাংলাদেশের পুলিশ বারবার বললেও যে আসামি মেঘালয় সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়েছে, ভারতীয় মিডিয়ার একটি অংশ বরং সেই তথ্যকে দুর্বল বা অবিশ্বস্ত হিসেবে হাজির করার চেষ্টা করেছে—যা এখন প্রত্যক্ষভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
এই ঘটনাকে অনেকেই ভারতের একটি অংশের মিডিয়ার “ক্যামোফ্লাজ কৌশল” হিসেবে দেখছেন, যেখানে তথ্য গোপন বা অর্ধ–সত্যকে সামনে এনে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের পক্ষকে সুবিধাজনক স্থানে রাখার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে রিপাবলিক টিভি ধরনের চ্যানেলগুলো যে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে জোরালো প্রচারণায় পরিণত করতে পারঙ্গম, ফয়সাল–ইস্যু সেই প্রবণতার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন।
সামনে কী: প্রত্যর্পণ, জবানবন্দি ও ষড়যন্ত্রের মুখোশ
ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা গেলে, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা মূল পরিকল্পনাকারী, কারা অর্থ–মদদদাতা এবং কোন রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক মহল থেকে এতে প্ররোচনা এসেছে—তা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে। তদন্ত–সংশ্লিষ্টদের আশা, জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সালের কাছ থেকে হাদিকে টার্গেট করার কারণ, অস্ত্রের উৎস, গোটা অপারেশন পরিচালনার নেপথ্য নির্দেশক এবং বিদেশে পালিয়ে থাকার সময় কে বা কারা তাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।
ওসমান হাদি হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচার শেষ হলে শুধু একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারই হবে না, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে তথ্য–যুদ্ধ, মিডিয়া–ম্যানিপুলেশন এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতা ও সফলতারও একটি নির্ভরযোগ্য উদাহরণ সামনে আসবে।
বাংলাদেশ পুলিশ বলছে, ফয়সাল ও আলমগীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চালু করা হবে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের আশা, ফয়সাল করিম মাসুদকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ওসমান হাদিকে হত্যা–পরিকল্পনা, অর্থের উৎস এবং নেপথ্যের রাজনৈতিক–কূটনৈতিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১২৩ বার পড়া হয়েছে