নওগাঁয় আলুর বাম্পার ফলন, দামে ধস-লোকসানে দিশেহারা কৃষক
বৃহস্পতিবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:৫৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বদলগাছী উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। চলতি মৌসুমে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আলু তোলার ব্যস্ততা চোখে পড়ছে—শ্রমিকের কাঁধে বস্তা, মাঠে সারি সারি সাদা-লাল আলুর স্তূপ।
একই চিত্র হাট-বাজারেও। বাইরে থেকে দেখলে প্রাচুর্য মনে হলেও, এই ফলনই যেন এখন কৃষকের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে। চড়া দামে সার ও কীটনাশক কিনে অধিক লাভের আশায় আবাদ করা আলু বিক্রি হচ্ছে এক কাপ চায়ের দামে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকালে বদলগাছী হাটখোলা বাজারে দেখা যায়, সাদা পাটনাই আলু পাইকারি বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ২৫০-২৮০ টাকা, ফাটা পাপড়ী (ছোট লাল-সাদা) ৪০০-৪৫০ টাকা এবং কার্ডিনাল আলু ২৫০-৩০০ টাকায়। ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম তলানিতে। কোনো কোনো জাতের আলু নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না পাইকাররা। উৎপাদনের হাসি মুছে গিয়ে কৃষকের চোখে এখন হতাশার ছাপ—ঘামে ফলানো আলু যেন হয়ে উঠেছে গলার কাঁটা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া ও সময়মতো পরিচর্যার কারণে এ বছর ফলন হয়েছে আশানুরূপ। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪৭০ হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে—যা নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে মিলছে না ন্যায্য দাম। স্থানীয় হাটে আলু বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ৫-৮ টাকায়, যা অনেক ক্ষেত্রে এক কাপ চায়ের দামের সমান বা তারও কম।
পাইকাররা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমেছে। তবে কৃষকদের দাবি, বর্তমান দামে উৎপাদন খরচের সামান্য অংশও উঠছে না।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, এ বছর সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি তুলনামূলক বেশি ছিল। অধিক লাভের আশায় অনেকে ধারদেনা করে আলু আবাদ করেছেন। মাঠ থেকে আলু তোলা, বাছাই, বস্তাবন্দি ও পরিবহন—সব মিলিয়ে খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বদলগাছী সদরের কৃষক আজাদুল ইসলাম বলেন, “প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ৩০-৪০ হাজার টাকা। আলু তোলা ও পরিবহনসহ সব খরচ মিলে এখন মাঠ থেকে আলু তোলার খরচই উঠছে না, মূলধন তো দূরের কথা। আলু চাষ করে বড় পাপ করেছি। এই দামে বিক্রি করে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।”
দেউলিয়া গ্রামের কৃষক হাসান জানান, “৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। বাজারদর শুনে আলু তুলতেই মন চাইছে না। আগামী বছর আর আলু চাষ করবো না। প্রতি বছরই লোকসান হচ্ছে।”
আরেক কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, “মিনকু জাতের আলু নিতে চাইছে না পাইকাররা। জমিতে ফেলে রাখলেও লোকসান, তুলে আনলেও লোকসান।”
কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করছেন। হিমাগারে রাখতে গেলেও ভাড়া ও পরিবহন খরচ বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তা ছাড়া গত বছরের মজুদ আলু এখনও হিমাগারে রয়েছে, যা আরও কয়েক মাস বাজারে সরবরাহ চলবে। মৌসুমের শুরুতেই অধিক আমদানির কারণে বাজারে দাম চাপে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
স্থানীয় বাজার বণিক সমিতির সভাপতি এখলাছুর রহমান বলেন, “চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য না থাকায় দাম কমেছে। তবে মাঠে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে, শহরের খুচরা বাজারে তার প্রতিফলন নেই। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা।”
বদলগাছী উপজেলা কৃষি অফিসার সাবাব ফারহান জানান, চলতি মৌসুমে আলুর উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষকদের সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বদলগাছীর অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে আলু চাষ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। ধারদেনা শোধ, পরিবারের ব্যয় এবং পরবর্তী আবাদ—সব মিলিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। হাটে স্তূপ করে রাখা আলুর দিকে তাকিয়ে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস—“এত কষ্ট করে আলু ফলালাম, এখন মনে হচ্ছে এই আলুই আমাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
১২০ বার পড়া হয়েছে