ইনডেমনিটি বনাম ন্যায়বিচার : পুলিশ হত্যার দায়মুক্তি কি সাংবিধানিক?
বৃহস্পতিবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও পালাবদলের সময় অতিবাহিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর দেশজুড়ে এক ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এই সময়ে বিশেষ করে ৫ আগস্ট এবং তার পরবর্তী কয়েক দিন দেশজুড়ে অসংখ্য থানায় হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যাতে বহু পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান।
প্রশ্ন হচ্ছে, হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাবার পর ছাত্র জনতার নামে কারা সারাদেশে থানা লুটপাট করেছে? কারা পুলিশ সদস্যদের খুন করেছে?
এসব বিষয়ে তদন্ত না করে সদ্য বিদায়ী অর্ন্তবর্তী সরকার একতরফাভাবে ইনডেমনিটি জারির মাধ্যমে ১৬ জুলাই হতে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সকল হত্যাকান্ডের বিচার বন্ধ করে গিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে কোনো নির্দিষ্ট হত্যাকান্ডের জন্য 'অবারিত দায়মুক্তি' বা ইনডেমনিটি দেওয়া বেশ জটিল এবং বিতর্কিত একটি বিষয়। কিন্ত ইউনুস সরকার আইনি ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাগুলো পাশ কাটিয়ে বা যথাযথ আইনি পর্যালোচনা ছাড়াই কাজটি করেছে৷ সংবিধানে আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের যে মৌলিক কাঠামো রয়েছে, তার সাথে যেকোনো ধরণের ঢালাও দায়মুক্তি সাংঘর্ষিক হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। ইনডেমনিটি জারি করে সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্নিত আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার খর্ব করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।" আবার ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তির জীবন বা স্বাধীনতা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না।
৫ আগস্ট বিকেলে যখন শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন সারাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিলেও অনেক স্থানে তা সহিংসতায় রূপ নেয়। চব্বিশের জুলাই থেকে চলা আন্দোলনে পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং শত শত শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে পুলিশের প্রতি তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল। এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে কারা থানায় আক্রমন করেছে এবং পুলিশ হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল তা বিচারবিভাগীয় তদন্ত করা জরুরি ছিল। কিন্ত অর্ন্তবর্তী সরকার সেটা না করে কাদের চাপে ইনডেমনিটি দিয়েছে সেটাও এখন বের করা জরুরি।
৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্টের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। তর্কের খাতিরে যদি বলা হয়, পলাতক সরকারের চাপে পড়ে পুলিশ ছাত্র জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসেবে পুলিশ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেও তাকে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে মারা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় কারা হামলা চালিয়ে অন্তত ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে এটা খুঁজে বের করা না গেলে চরম অন্যায় হবে। নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারের আইনী ও বিচার চাইবার পথ ইনডেমনিটি জারি করে বন্ধ রাখা মানবাধিকার লংঘন । যদি পুলিশ সদস্যদের হত্যার বিচার না হয় বা সুনির্দিষ্ট খুনিদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হয়, তবে সেটি এই অনুচ্ছেদগুলোর পরিপন্থী। কারণ পুলিশের জীবনও অন্য যেকোনো নাগরিকের মতো আইনের সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য।
সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদে বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো অপরাধের জন্য প্রচলিত আইনে বিচার হওয়া একটি সাংবিধানিক অধিকার। দায়মুক্তি দিয়ে এই অধিকার কেড়ে নেওয়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী ।
বাংলাদেশের সংবিধানে দায়মুক্তি দেওয়ার একটি বিশেষ ক্ষমতা সংসদকে দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৪৬ অনুযায়ী "জাতীয় সংসদ আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তিকে... শৃঙ্খলা-রক্ষা বা পুনরুদ্ধারের কার্যের জন্য দায়মুক্ত করিতে পারিবেন।"
প্রশ্ন হচ্ছে, 'ডকট্রিন অব নেসেসিটি' (Doctrine of Necessity) বা 'প্রয়োজনীয়তার নীতি'র আওতায় নেওয়া এই সিদ্ধান্তগুলো স্থায়ী কোনো দায়মুক্তি দিতে পারে কি না।
৪৬ অনুচ্ছেদটি সাধারণত সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বেসামরিক সাধারণ মানুষ বা বিক্ষোভকারীদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে দায়মুক্তি দেওয়া সংবিধানের মূল চেতনার সাথে খাপ খায় কি না, তা নিয়ে উচ্চ আদালতে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে এর আগেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল (যেমন ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার বন্ধে)। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্ট সেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল যে, "বিচার পাওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া সংবিধানের মৌলিক কাঠামো লঙ্ঘন করে।"
বর্তমান পরিস্থিতির আইনি ব্যাখ্যা
অন্তর্বর্তী সরকার যে দায়মুক্তির কথা বলেছে, সেটি মূলত "রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানিমূলক মামলা" বন্ধ করার জন্য। কিন্তু যদি কোনো পুলিশ সদস্যকে থানায় ঢুকে হাত-পা বেঁধে বা পুড়িয়ে মারা হয়, তবে সেটি আন্তর্জাতিক আইন (International Humanitarian Law) অনুযায়ী "মানবতা বিরোধী অপরাধ" বা "গুরুতর অপরাধ" হিসেবে গণ্য হতে পারে। আবার আপনি যদি দায়মুক্তির কথা আনেন, তাহলে কীসের জন্য আপনি দায় দিচ্ছেন? আপনি কী অপরাধ করলেন যে আপনি দায়মুক্তি চান? এখন আপনি যদি বলেন, আমি পুলিশ মেরে ফেলেছি, থানা জ্বালিয়ে দিয়েছি, আমি খুন করেছি, লুট করেছি – আমাকে দায়মুক্তি দেন – এটাতো ন্যায্য না।
এই ধরনের অপরাধে রাষ্ট্র যদি বিচার না করে, তবে ভবিষ্যতে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আদালতে রিট করলে বা উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এই দায়মুক্তির আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
আত্মরক্ষা বা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হলেও, পরিকল্পিত বা নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া সরাসরি সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শেষ পর্যন্ত এই বিষয়টির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার কেবল বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের।
পুলিশ হত্যাকান্ড নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের
প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে এই কয়েক দিনে ৪৪ জনের বেশি পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার তাগিদে বা আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে পুলিশ সদস্যরা থানা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
পরবর্তী ফলাফল ও নিরাপত্তাহীনতা
পুলিশের ওপর এই নির্বিচার হামলার ফলে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে ছিল না। থানাগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ায় সারাদেশে ডাকাতি, লুটতরাজ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয় এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চালানো হয়।
গণঅভ্যুত্থানের সময়ে পুলিশের ওপর এই হামলা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। একদিকে যেমন পুলিশের গুলিতে শত শত শিক্ষার্থীর প্রাণ হারানো একটি বিচার্য বিষয়, তেমনি নিরস্ত্র বা আত্মসমর্পণকারী পুলিশ সদস্যদের পিটিয়ে হত্যা করাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই সহিংসতা দেশের বিচারব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে।
ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি সাধারণত রাজনৈতিক কর্মীদের দেওয়া হয় যাতে তারা হয়রানির শিকার না হন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড বা যুদ্ধাপরাধের মতো গুরুতর অপরাধে ইনডেমনিটি আন্তর্জাতিক আইনের চোখে টেকসই হয় না। তাই ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যদি আইনি লড়াই চালিয়ে যায় এবং তদন্তে সুনির্দিষ্ট অপরাধী শনাক্ত হয়, তবে বিচারের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলা যাবে না। নির্বাচনের পর সময় এসেছে নিহতদের ভুক্তভোগী পরিবার পরিজনকে হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে মামলা করা। এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রকৃত উস্কানিদাতা বা নির্দেশদাতাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনা প্রয়োজন, যা কোনভাবে অযৌক্তিক হবে না।
ন্যায়বিচার কখনোই খণ্ডিত হতে পারে না; এক পক্ষের বিচার করে অন্য পক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
১০৪ বার পড়া হয়েছে