নওগাঁর ৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী, ভোট বিভক্তির শঙ্কা
বুধবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১:৪২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নওগাঁর ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইস্যুতে দলটি বড় ধরনের অস্বস্তিতে পড়েছে।
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া তিন নেতা নিজ নিজ এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করায় বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে দলীয় প্রার্থীদের জয়ের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর নওগাঁ-১, নওগাঁ-৩ ও নওগাঁ-৬ আসনকে ঘিরে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে। এই তিন আসনে বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী, পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির।
নওগাঁ-১ আসন : নিয়ামতপুর, পোরশা ও সাপাহার উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নিয়ামতপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি দলীয় প্রার্থী ছিলেন।
এ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ডা. ছালেক চৌধুরী। তিনি একসময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন এবং ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর দলীয়ভাবে তাকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হলেও তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করায় প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তবুও তিনি মাঠে সক্রিয় থাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। তার পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দলীয় প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান দাবি করছেন, তৃণমূল নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
নওগাঁ-৩ আসন : মহাদেবপুর ও বদলগাছী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফজলে হুদা বাবুল।
এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার আকতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি। তিনি আগে মহাদেবপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য ছিলেন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন। পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও স্থানীয় প্রভাবের কারণে এলাকায় তার একটি শক্ত ভোটব্যাংক রয়েছে।
দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার পরও তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি। ফলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় নেতাদের মতে, তার প্রার্থিতা বিএনপির ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দলীয় প্রার্থী দাবি করছেন, সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।
নওগাঁ-৬ আসন : রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর কবির। তিনি পঞ্চম থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ পর্যন্ত একাধিকবার নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময়ে দল পরিবর্তন করলেও পরবর্তীতে বিএনপিতে ফেরেন।
এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন এবং তা বৈধ হয়। সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় তাকে আলাদা করে সমর্থক তালিকা জমা দিতে হয়নি। দল থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হলেও তিনি নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ইতোমধ্যে তার পক্ষে কাজ করার অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আত্রাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ রেজাউল ইসলাম। তিনি ২০২০ সালের উপনির্বাচনেও দলীয় প্রার্থী ছিলেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে এখানে সাংগঠনিক বিভক্তি দেখা দিয়েছে, যদিও মনোনীত প্রার্থী ঐক্যের কথা বলছেন।
জেলা বিএনপির নেতারা জানিয়েছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় বিদ্রোহীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় ঐক্য ধরে রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয়ের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে নওগাঁর এই তিন আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয়তা বিএনপির ভোটের হিসাব-নিকাশে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নির্বাচনের মাঠে দলীয় ঐক্য কতটা ধরে রাখা যায়, সেটিই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
১৫৪ বার পড়া হয়েছে