সাতক্ষীরার চার আসনে প্রচারণা তুঙ্গে, বিএনপি-জামায়াতের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস
বৃহস্পতিবার , ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরায় রাজনীতির মাঠ এখন সরগরম। নতুন আসন বিন্যাস ও প্রতীক বরাদ্দের পর জেলার চারটি সংসদীয় আসনেই প্রার্থীরা পুরোদমে গণসংযোগ ও প্রচারণায় নেমেছেন।
গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই পোস্টার, ব্যানার, মিছিল ও পথসভায় মুখর হয়ে উঠেছে এলাকা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রার্থীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে সাতক্ষীরায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ এবং জামায়াতের শক্তিশালী সংগঠনিক প্রস্তুতি—এই দুই বাস্তবতায় চারটি আসনেই সমানতালে কঠিন লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সাতক্ষীরার আসনগুলো পুনরুদ্ধারে বিএনপি মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সাতটি উপজেলা, আটটি থানা, তিনটি পৌরসভা ও ৭৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সাতক্ষীরা জেলায় চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৪২৪ জন। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ এখানকার মানুষের পুরোনো। ফলে এবারের নির্বাচনে নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, লবণাক্ততা, কর্মসংস্থান সংকট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভোটের মাঠে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সাতক্ষীরার পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াত ও একটিতে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। ১৯৯৬ সালে জামায়াত সদর আসনে জয় পায়। ২০০১ সালে জামায়াত তিনটি আসনে জয়লাভ করে এবং ওই নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো সাতক্ষীরা-১ আসনে বিএনপি বিজয়ী হয়। ২০০৮ সালে আসন সংখ্যা কমে চারটি হলে বিএনপি ও জামায়াত কোনোটিই আসন পায়নি।
সাতক্ষীরা-১ (তালা–কলারোয়া)
এই আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব (ধানের শীষ), জামায়াতের মো. ইজ্জত উল্লাহ (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলনের শেখ মো. রেজাউল ইসলাম (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান (লাঙ্গল) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের এডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম (ডাব)।
বিএনপি প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন, গত ১৬ বছরে এলাকায় তেমন উন্নয়ন হয়নি। নির্বাচিত হলে পাটকেলঘাটা থানাকে উপজেলা করা ও তালাকে পৌরসভায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জামায়াত প্রার্থী মো. ইজ্জত উল্লাহ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
সাতক্ষীরা-২ (সদর–দেবহাটা)
এই আসনে বিএনপির আব্দুর রউফ (ধানের শীষ), জামায়াতের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান (লাঙ্গল), বাংলাদেশ জাসদের ইদ্রিস আলী (কার) ও ইসলামী আন্দোলনের মুফতি রবিউল ইসলাম (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রউফ বলেন, জনগণের সমর্থন ও ভালোবাসাই তার শক্তি। নির্বাচিত হলে সর্বদা মানুষের পাশে থাকবেন।
জামায়াত প্রার্থী আব্দুল খালেক বলেন, জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই তাদের বড় শক্তি। এলাকার উন্নয়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাতক্ষীরা-৩ (কালীগঞ্জ–আশাশুনি)
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে জমে উঠেছে। বিএনপির কাজী আলাউদ্দীন (ধানের শীষ), বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. শহিদুল আলম (ফুটবল), জামায়াতের হাফেজ রবিউল বাশার (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আলিপ হোসেন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের ওয়েজ কুরনী (হাতপাখা) ও বিএমজেপির রুবেল হোসেন (রকেট) মাঠে রয়েছেন।
ডা. শহিদুল আলম বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবির মুখেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির কাজী আলাউদ্দীন বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, জনগণই তার মূল্যায়ন করবে।
জামায়াত প্রার্থী রবিউল বাশার বলেন, ভোটাররা সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকেই বেছে নেবে বলে তিনি আশাবাদী।
বিএনপির তৃণমূল নেতাদের আশঙ্কা, বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে ভোট বিভক্ত হলে জামায়াত সুবিধা পেতে পারে।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর)
এই আসনে বিএনপির ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান (ধানের শীষ), জামায়াতের জিএম নজরুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), জাতীয় পার্টির আব্দুর রশীদ (লাঙ্গল) ও ইসলামী আন্দোলনের এইচ এম মিজানুর রহমান (হাতপাখা) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপি প্রার্থী মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে কাজ করে আসছেন, বিশেষ করে তরুণ সমাজের উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছেন।
জামায়াত প্রার্থী নজরুল ইসলাম বলেন, তারা অতীতের মতো ভবিষ্যতেও জনগণের পাশে থাকবেন এবং ভোটারদের আস্থা তার প্রতি রয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমতুল্লাহ পলাশ বলেন, দীর্ঘ নির্যাতন ও প্রতিকূলতার পরও তাদের নেতাকর্মীরা জনগণের পাশে থেকেছেন। চারটি আসনেই বিএনপির বিজয় নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুল আজিজ বলেন, কঠিন সময়েও তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছিলেন। এবারও চারটি আসনেই জামায়াত বিজয়ী হবে বলে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
১০৬ বার পড়া হয়েছে