ভারতে ভোটার তালিকায় বাদ পড়ছেন মুসলিম, অভিবাসী ও আদিবাসীরা
বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ২:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদের নামে চলমান ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় মুসলিম, অভিবাসী, আদিবাসীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের এই কার্যক্রম তাড়াহুড়া ও অগোছালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালার নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না—এমন মন্তব্য উঠে এসেছে এক নাগরিক জুরি প্রতিবেদনে।
গত ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ‘ভারত জোড়ো অভিযান’, পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) এবং ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব পিপলস মুভমেন্টস (এনএপিএম) আয়োজিত ‘সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার রক্ষা’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে এই জুরি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সেখানে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, বিহার, গুজরাট, তামিলনাড়ু, গোয়া ও উত্তর প্রদেশের নাগরিকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুথ লেভেল কর্মকর্তা (বিএলও)দের মাধ্যমে পরিচালিত সংশোধন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত নথিপত্রের ওপর নির্ভরতা এবং ২০০৩ সালের পুরোনো ভোটার তালিকার সঙ্গে সংযোগ খোঁজার কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র, ভাসমান ও স্থায়ী ঠিকানাহীন নাগরিকেরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিতি, ধর্ম, পরিচয়, বয়স, লিঙ্গ ও জীবনযাত্রার মানের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও উঠে এসেছে।
রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে কৃষিশ্রমিকদের বড় একটি অংশ কাজের প্রয়োজনে অন্য রাজ্যে অবস্থান করায় সংশোধনের সময় বাড়িতে অনুপস্থিত ছিলেন। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৯৫০ সালের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলে নিষিদ্ধ মিলিশিয়া সালওয়া জুডুমের সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষ নিবন্ধন ফরম পাননি। ঘরবাড়ি ধ্বংস ও নথিপত্র হারানোর কারণে এই অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম ভোটারদের নিবন্ধনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বসতি উচ্ছেদের পর বাসিন্দাদের ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় না তোলার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে শতাধিক ভাসমান ভোটারকে ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে নাম কাটার হুমকির অভিযোগ রয়েছে, যদিও তাঁদের কাছে দীর্ঘদিনের ভোটার হওয়ার প্রমাণ রয়েছে।
মুম্বাই, জলন্ধর ও হায়দরাবাদে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চবিত্ত এলাকায় ভোটার নিবন্ধনের হার যেখানে ৭৪ শতাংশ, সেখানে বস্তি এলাকায় তা ৫০ শতাংশের নিচে। নারী ভোটারদের সংখ্যাও অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। বিয়ের পর পৈতৃক গ্রাম ছাড়ার কারণে অনেক নারী যাচাইযোগ্য আত্মীয় দেখাতে পারছেন না। একই কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ট্রান্সজেন্ডাররাও তালিকার বাইরে পড়ছেন।
বিহার ও গুজরাটে জীবিত ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় ‘মৃত’ দেখানোর ঘটনাও উঠে এসেছে। এতে বয়স্করা ভোটাধিকার হারানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ভাতাও পাচ্ছেন না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির নাম কাটা পড়লে তাঁর সন্তানদের নামও ঝুঁকিতে পড়ে, কারণ নাগরিকত্ব প্রমাণে পারিবারিক নথি দেখাতে না পারলে তাঁদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়াই ভোটার তালিকার সঙ্গে আধার কার্ড যুক্ত করায় ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ও নজরদারির আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা জানান, বিএলও কর্মকর্তারাও প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে কাজ করছেন; কয়েকটি রাজ্যে তাঁদের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। তবে নির্বাচন কমিশন এই চাপের বিষয়টি স্বীকার করছে না বলে অভিযোগ করা হয়।
১০৭ বার পড়া হয়েছে