বেনাপোল বন্দরে ফের চাঁদাবাজি: সাংবাদিক পরিচয়ধারীর বেপরোয়া কার্যক্রম
রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১:২৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দীর্ঘদিন ধরে বেনাপোল স্থলবন্দরে চাঁদাবাজি ও দালালির অভিযোগে জড়িত থাকা সাংবাদিক পরিচয়ধারী সুমন হোসেন (৩৭) আবারও প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়েছেন।
বন্দরের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি এখন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং বিভিন্ন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের নথি অনুযায়ী, সুমন দীর্ঘদিন ধরে পাসপোর্ট দালালি ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কোনো অনুমতি ছাড়াই তিনি বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাসপোর্ট যাত্রীদের লাইনের বাইরে দ্রুত ভারতে পাঠানোর কথা বলে জনপ্রতি ২–৩ হাজার টাকা আদায় করতেন। পাশাপাশি বন্দরের শেড ইনচার্জ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাকালীন সময়ে বেনাপোল বন্দরের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) শাহিদা শারমিন ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বেনাপোল পোর্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তবে রহস্যজনকভাবে এটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় ১০ সেপ্টেম্বর। এরপর পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল চার্জশিট দাখিল করে। কিন্তু চার্জশিট দাখিলের পরও আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, আইনের এই শিথিলতা সুযোগ নিয়ে সুমন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
বেনাপোল বন্দরের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সুমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি দিতেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর প্রচারণা চালাতেন এবং একবার তৎকালীন চেয়ারম্যানকে বন্দরের গেস্টহাউসে অবরুদ্ধও করেছিলেন। এমনকি তার কাস্টম হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল।
বেনাপোল বন্দরের তখনকার পরিচালক রেজাউল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট বাংলাদেশের স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. জিল্লুর রহমান বন্দরের পরিদর্শনে গেলে সুমন দলবল নিয়ে গেস্টহাউস ঘেরাও করে তাকে কার্যত আটকে রাখেন। এটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নজিরবিহীন দুঃসাহস বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুমন আবারও সক্রিয়ভাবে বন্দরের আশপাশে বিভিন্ন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করছেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ব্যবসা বন্ধ করার হুমকি এবং মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানোর ভয় দেখানো হচ্ছে।
বেনাপোল আমদানি রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, 'এখন এটি দালালি নয়, এটি প্রকাশ্য চাঁদাবাজি। মামলা আর চার্জশিট থাকা সত্ত্বেও একজন চিহ্নিত অপরাধী যদি বন্দরে ঘুরে বেড়ায়, আমরা কীভাবে ব্যবসা চালাবো? আইন যদি কাজ না করে, অপরাধীর সাহস আরও বাড়বে। যাদের তাকে রক্ষা করার সুযোগ দিয়েছে, তাদের নামও সামনে আসা উচিত। না হলে বেনাপোল বন্দর চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, চার্জশিটের পরও গ্রেপ্তার না হওয়া কি কেবল অবহেলা, নাকি ইচ্ছাকৃত? কার ছত্রচ্ছায়ায় একজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরে দাপট দেখাচ্ছে?
এ বিষয়ে বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন জানান, 'গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সহকারি পরিচালক শাহিদা শারমিন অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। মামলাটি তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আসামি ধরার জন্য থানা প্রস্তুত আছে। সময় সুযোগ বুঝে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।'
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, 'চলমান দায়িত্বে আমাদের লক্ষ্য বন্দরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ বা অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চার্জশিটভুক্ত আসামির বন্দরে অবাধ চলাচল চলতে পারবে না। নিয়মবহির্ভূত প্রবেশ বা ব্যবসায়ীদের হয়রানি হলে তা গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।'
১৯৬ বার পড়া হয়েছে