ম্যাচের উত্তাপ, সীমান্তের বারুদ: ফিরে আসছে ১৯৬৯-এর ফুটবল নিয়ে দুই দেশের যুদ্ধ
বৃহস্পতিবার , ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ৩:২৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
এই যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল ফুটবল মাঠে নয়, শুরু হয়েছিল দুই সীমান্ত গ্রামের ধুলোমাখা পথ আর মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভে।
কিন্তু শেষ আঘাতটা এসে পড়ে সবুজ ঘাসে আঁকা এক মাঠ থেকে- ১৯৭০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ফুটবল ম্যাচ দিয়ে।
হন্ডুরাসের সীমান্তের কাছে ছোট্ট এক গ্রামে দিনমজুর সালভাদরান কৃষক পরিবারের ছেলে কার্লোস সকাল থেকে জমিতে কাজ করে, আর রাতে ফুটবল খেলে। জমি নেই, নিরাপত্তা নেই, তবু তাঁর চোখে আছে একটাই স্বপ্ন- নিজের দেশ এল সালভাদর বিশ্বকাপে খেলবে, আর সে রেডিওর সামনে বসে কান পেতে থাকবে। ওই সময় হন্ডুরাসের গ্রামগুলোতে সালভাদরান অভিবাসীদের নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে; এদের অনেকে প্রজন্ম ধরে ওখানেই থাকে, কিন্তু জমি সংস্কার আর মালিকানার প্রশ্নে তারা দিন দিন অবাঞ্ছিত হয়ে উঠছে।শমাঠের বাইরে এই টানাপোড়েন, অপমান আর ভয়ের গল্পগুলো ধীরে ধীরে ঘুরে এসে ফুটবল গ্যালারিতে জায়গা করে নেয়, যেখানে পতাকার রঙই যেন হয়ে ওঠে পরিচয়ের শেষ আশ্রয়।
১৯৬৯ সালের প্রথম লেগের ম্যাচ হন্ডুরাসের রাজধানী তেগুসিগালপায়, স্টেডিয়ামে ঢোকার আগেই বোঝা যাচ্ছিল এটা কেবল খেলা নয়, দুই দেশের মান-সম্মানের লড়াই। হন্ডুরাসের সমর্থকেরা সালভাদরান টিমের হোটেলের সামনে রাতভর স্লোগান দেয়, আতশবাজি ফোটায়, যেন ঘুমহীন ক্লান্ত করে মাঠে নামাতে পারলে জয়টা আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে যায়। সেই ম্যাচে হন্ডুরাস জেতে, কিন্তু মাঠের ফলের চেয়ে গ্যালারির ঘৃণা বেশি তেঁতো হয়ে থাকে হার-না–মানা সালভাদরান সমর্থকদের স্মৃতিতে।সপরদিন এল সালভাদরের এক তরুণ সমর্থকের আত্মহত্যার খবর সংবাদমাধ্যম এমনভাবে ছাপে, যেন খেলার পরাজয়ের সঙ্গে পুরো জাতির মান-সম্মান সমাহিত হয়েছে।
কিছুদিন পর যখন ফিরতি ম্যাচ হয় সান স্যালভাদরে, শহরটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়—দেয়ালে দেয়ালে শ্লোগান, শত্রু দেশের পতাকা পুড়িয়ে মিছিল, রেডিওতে উত্তেজক ভাষণ।হন্ডুরাস দলের বাস স্টেডিয়ামে পৌঁছোনোর আগেই পাথরবৃষ্টি আর গালি-ধ্বনিতে ডুবে যায়, খেলোয়াড়দের চোখে স্পষ্ট ভয়, আর গ্যালারিতে বসে থাকা কার্লোসের মতো তরুণদের চোখে কেবল প্রতিশোধ। সেই ম্যাচে এল সালভাদর জেতে, কিন্তু জয়ের রাতেই খবর আসে—সীমান্তে সালভাদরান অভিবাসীদের বাড়িঘরে হামলা, দেশছাড়া মানুষের কাফেলা, আর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়ার খবর। মাঠের গ্যালারিতে যেটা শুরু হয়েছিল “তোমরা আমাদের অপমান করেছ” স্লোগানে, সেটা সীমান্তে গিয়ে পরিণত হয় “তোমরা এখানে আর থাকতে পারবে না” এই সব ধমক দিতে থাকে।
তৃতীয় ও নির্ণায়ক প্লে-অফ ম্যাচ মেক্সিকো সিটিতে, নিরপেক্ষ মাঠে, কিন্তু দর্শকদের আবেগ আর মিডিয়ার ভাষা এতটাই বিভক্ত যে স্টেডিয়ামের ভেতরেই যেন দুই দেশের পতাকা দু’টি অদৃশ্য সীমান্ত টেনে দিয়েছে। খেলা চলার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি ফাউল, প্রতিটি অফসাইড, প্রতিটি গোল দুই দেশের ঘরে ঘরে রাজনৈতিক আলোচনার উপকরণ হয়ে ওঠে—“আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”, “ওদের শাস্তি চাই”—এই শব্দগুলো মাইক্রোফোন আর সংবাদপত্রের কলামে বারবার ফিরে আসে।এল সালভাদর শেষ পর্যন্ত প্লে-অফ জিতে নেয়, আর সেই মুহূর্তে কার্লোসসহ লাখো সমর্থকের চোখে খেলার জয় মিশে যায় রাষ্ট্রীয় বিজয়ের অনুভূতিতে। কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেক পরই সীমান্ত এলাকায় গুলির শব্দ, সৈন্য সমাবেশ আর যুদ্ধবিমানের প্রস্তুতির খবর ভেসে যায় রেডিও তরঙ্গে।
১৪ জুলাই ১৯৬৯, এল সালভাদরের সেনাবাহিনী হন্ডুরাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে-ট্যাংক, সৈন্য, বিমান হামলাসহ পূর্ণাঙ্গ সামরিক আক্রমণ; ইতিহাসে যা “ফুটবল যুদ্ধ” কিংবা “১০০ ঘন্টার যুদ্ধ” নামে চিহ্নিত। কার্লোসের মতো অনেক তরুণ, যারা কয়েক সপ্তাহ আগেও রাতে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে গেয়েছে জাতীয় সঙ্গীত, এখন সীমান্তে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, শত্রু হিসেবে যাদের মুখ দেখেছে কেবল অন্য দেশের জার্সি গায়ে। কয়েক দিনের গোলাগুলিতে দু’দেশেই শত শত মানুষ মারা যায়, হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়, আর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যুদ্ধবিরতি হলেও দু’দেশের সম্পর্কের ভাঙন আর মানুষের ক্ষত অনেক বছর স্থায়ী হয়ে থাকে। পরে বিশ্লেষকেরা বলেন, মূল কারণ ছিল জমি, অভিবাসন আর অর্থনৈতিক বৈষম্য—ফুটবল আসলে ছিল বারুদের স্তূপে ছিটিয়ে দেওয়া শেষ ঘি, যেটা আগুনের মুহূর্তটা এনে দিয়েছিল মাত্র।
যুদ্ধ শেষে যখন কার্লোস ফিরে আসে, তার গ্রামের অনেক পরিবার আর নেই—কেউ পালিয়ে গেছে, কেউ ফিরতে পারেনি, আর মাঠের গোলের আনন্দের বদলে তার মাথার ভেতর ঘোরে কেবল কামানের শব্দ।সএকদিন ভাঙা গ্যালারির সিঁড়িতে বসে সে পুরোনো ফুটবলটা হাতে নিয়ে ভাবে, কখন যেন এই বলটা খেলা থেকে জাতির ক্রোধের প্রতীকে পরিণত হলো, আর পতাকাগুলো গ্যালারি থেকে নেমে এসে ট্যাংকের পাশে উড়তে লাগল। সে বোঝে, খেলা কখনোই একা যুদ্ধ ডেকে আনে না; কিন্তু যখন রাষ্ট্র, মিডিয়া আর জমে থাকা বঞ্চনা মিলেমিশে খেলাকে অস্ত্রে পরিণত করে, তখন গোলপোস্টের দুই পাশে আর কোনো দল থাকে না—থেকে যায় কেবল মানুষ এবং তাদের ক্ষত।
কার্লোসের প্রিয় সেই মাঠটা তাই ইতিহাসের পাতায় লেখা হয় “ফুটবল যুদ্ধের” জন্মস্থান হিসেবে, আর সে নিজে আজীবন মনে রাখে খেলার আনন্দের সঙ্গে যুদ্ধের অন্ধকার একসঙ্গে ধরতে পারা এক যুগের সাক্ষী হিসেবে।
[এই কাহিনীটি লেখা হয়েছে বর্তমান খেলা–কেন্দ্রিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ফুটবল যুদ্ধের ইতিহাসকে টেনে আনার জন্য, যেন বোঝানো যায়—মাঠের আবেগ, মিডিয়ার উস্কানি ও অন্ধ জাতীয়তাবাদ মিললে খেলা কখনও বাস্তব সহিংসতা ও যুদ্ধের দিকেও গড়াতে পারে; তাই খেলার উত্তাপ যেন মানবিকতা, সংযম ও সহনশীলতাকে ছাড়িয়ে না যায়—এই সতর্ক বার্তাই কাহিনীর মূল উদ্দেশ্য]
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
১৯৩ বার পড়া হয়েছে