১৮০০ টাকা বাঁচাতে ট্রাকে চড়া, নওগাঁর ১০ প্রাণের ঈদযাত্রা শেষ
সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬ ৯:১৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভরশো ইউনিয়নে এখন শুধুই কান্না আর আহাজারি। ঈদুল আজহা উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে কর্মস্থল নোয়াখালী থেকে বাড়ি ফিরছিলেন ১০ জন যুবক।
বাসভাড়া বেশি হওয়ায় তারা যাত্রীবাহী বাসের পরিবর্তে পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রা করেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই হয়ে ওঠে তাদের জীবনের শেষ যাত্রা।
টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর পূর্বপাড় এলাকায় ভয়াবহ ট্রাক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১৫ জন। নিহতদের মধ্যে নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভরশো ইউনিয়নের ৯ জন এবং নিয়ামতপুর উপজেলার একজন রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০ জন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালী থেকে ছেড়ে আসা রডবোঝাই একটি ট্রাক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে পৌঁছালে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাকটি উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন, পরে হাসপাতালে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে ভরশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের মোহাম্মদ তারেক, আব্দুল বারেক, বাদশা মিয়া, সোহাগ হোসেন, রবিউল ইসলাম ও সাগর; মুর্শিদপুর গ্রামের মইনুর ইসলাম এবং পাকুড়িয়া গ্রামের দুই ভাই মাইনুল ও গিয়াস উদ্দিন রয়েছেন। এছাড়া নিয়ামতপুর উপজেলার মালঞ্চি গ্রামের একজনও নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ হোসেন জানান, নোয়াখালীর উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে এ এলাকার শতাধিক যুবক বিভিন্ন ধরনের ফেরি ব্যবসা করেন। ঈদের সময় বাড়ি ফিরতে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। এজন্য অনেকে খরচ বাঁচাতে পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। নিহতরাও একই কারণে ট্রাকে বাড়ি ফিরছিলেন।
নিহত তারেকের বাবা সুলতান হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ছেলে ও অন্যরা মানুষের চুল কেনা, পুরোনো মোবাইল ও প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রির কাজ করতেন। ঈদের ছুটিতে সবাই একসঙ্গে বাড়ি ফিরছিলেন। বাসে অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ায় তারা ট্রাকে ওঠেন। কিন্তু সামান্য টাকা বাঁচাতে গিয়ে সবকিছু হারাতে হলো পরিবারগুলোকে।
স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। সাবিনা জানান, বাড়ি ফেরার পথে রাত ১০টার দিকে স্বামীর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। মেয়ের জন্য নতুন জামা ও মেহেদি আনার কথাও বলেছিলেন তিনি। সকালে পান মৃত্যুর খবর।
একই ইউনিয়নের ৯ যুবকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো মান্দা ও নিয়ামতপুর এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার জাহান সাথী জানান, নওগাঁ জেলা প্রশাসনের সঙ্গে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন সমন্বয় করে মরদেহগুলো নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। সরকারি খরচে মরদেহ পরিবহন, দাফন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া নিহত পরিবারগুলোর জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো নওগাঁ পৌঁছাতে মধ্যরাত হতে পারে। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে জানাজা ও দাফনের সময় নির্ধারণ করা হবে। ভরশো ইউনিয়নের সব মরদেহ একসঙ্গে জানাজার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১২০ বার পড়া হয়েছে