সর্বশেষ

সাহিত্য

সৈয়দ মুজতবা আলী: বিশ্বমনীষার দর্পণে এক মহাজাগতিক পরিব্রাজকের শব্দকল্পদ্রুম

গাউসুর রহমান 
গাউসুর রহমান 

বৃহস্পতিবার , ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:৩২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলা সাহিত্যের সুবিশাল ও সুগভীর অমরাবতীতে সৈয়দ মুজতবা আলী এমন এক জ্যোতিষ্ক, যার কিরণচ্ছটা কেবল একটি নির্দিষ্ট দিগন্তকে উদ্ভাসিত করেনি, বরং বিশ্বসংস্কৃতির বিচিত্র বর্ণিল ছটায় তা দেদীপ্যমান। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন বাংলা গদ্যরীতি একদিকে বঙ্কিমী গাম্ভীর্য এবং অন্যদিকে রবীন্দ্র-নৈকট্যের মধুর আবেষ্টনীতে আবর্তিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই মুজতবা আলী তাঁর অনন্য ‘মজলিশী’ গদ্যের অনুপম ঝংকারে পাঠককে এক নতুন ঘরানার আস্বাদ দান করলেন।

তাঁর জীবন ছিল এক দীর্ঘ পরিব্রাজন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে হৃদয়ের গহীন অরণ্যে এবং ধী-শক্তির অত্যুন্নত শিখরে। শান্তিনিকেতনের মুক্তাঙ্গন থেকে কায়রোর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা বার্লিন-বন-লন্ডনের উচ্চতর বিদ্যাপিঠ সর্বত্রই তাঁর বিচরণ ছিল স্বচ্ছন্দ। 

মুজতবা আলীর সাহিত্যিক আধারটি কেবল তথাকথিত রসবোধ বা হাস্যরসের আধারে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর হাস্যরস হলো ‘হোরেসীয় ব্যঙ্গরীতি’র এক অনন্য প্রকাশ, যেখানে বিদ্রূপের হুল নেই, আছে সংশোধনের এক স্নিগ্ধ প্রলেপ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর মুখবন্ধে তিনি যখন বলেন, “বই কিনে কেউ দেউলে হয় না। দেউলে হয় তারা যারা মদ খায়, জুয়া খেলে, কিংবা যারা পরের সুন্দরী স্ত্রীর পেছনে পয়সা নষ্ট করে। বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলে হয়নি।” তখন তাঁর এই উচ্চারণের আড়ালে সমাজ-মানসের এক গভীর সত্য এবং রুচিগঠনের এক সূক্ষ্ম ইশারা লক্ষ করা যায়। এই উক্তিটি কেবল পাঠাভ্যাসের মহিমা কীর্তন করে না, বরং একজন সংস্কৃতিবান মানুষের জীবনদর্শনের এক অমোঘ সারকথা হিসেবে চিহ্নিত হয়। তাঁর সাহিত্যচর্চার এই ভঙ্গিটি ছিল অত্যন্ত আলাপচারিতামূলক, যাকে সমালোচকরা ‘বেলে-লেত্র’ (Belles-lettres) বা সুকুমার গদ্য বলে অভিহিত করেছেন। এখানে পাণ্ডিত্য ও লঘুত্বের এক অপূর্ব সহাবস্থান লক্ষ করা যায়। তিনি যখন কোনো তাত্ত্বিক কথা বলেন, তখন তাঁর সেই তত্ত্ব গুরুভার হয়ে পাঠকের কাঁধে চেপে বসে না, বরং তা বসন্তের দক্ষিণা বাতাসের মতো মনের কোণে দোলা দিয়ে যায়।

মুজতবা আলীর সাহিত্যিক দর্শনে আমরা এক ধরনের ‘কসমোপলিটানিজম’ বা বিশ্বনাগরিকতার প্রতিফলন দেখতে পাই। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তাঁর ‘দেশে বিদেশে’ ভ্রমণকাহিনীটি কেবল একটি ভৌগোলিক ভ্রমণের বিবরণ নয়, বরং তা হলো মানবাত্মার এক চিরন্তন যাত্রার দলিল। আফগানিস্তানের কাবুল শহরের যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা যেন শব্দ দিয়ে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। সেখানে তিনি আবদুর রহমান নামক ভৃত্যটির যে মানবিক চিত্র অঙ্কন করেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ চরিত্রগুলোর পার্শ্বে স্থান পাওয়ার যোগ্য। মুজতবা আলী লিখেছেন, “কাবুল শহরটি অতি অদ্ভুত। সেখানে ধুলো আছে, আছে দুর্গন্ধ, কিন্তু সেখানে আছে এমন এক মানুষ যাদের ভেতরটা স্বচ্ছ কাঁচের মতো।” এই যে মানুষের ভেতরের সত্যকে দেখার দৃষ্টি, এটিই তাঁর সাহিত্যিক সিদ্ধি। তিনি যখন কাবুলের পথে ধাবমান, তখন তাঁর লেখায় আলবেয়ার কামুর অস্তিত্ববাদ কিংবা ফ্রাঞ্জ কাফকার বিপন্নতার সুর নয়, বরং এক আদিম ও অকৃত্রিম মানবতাবাদের জয়গান অনুরণিত হয়। তাঁর পর্যটন আসলে আত্ম-আবিষ্কারেরই নামান্তর। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীকে জানতে হলে নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাঁর এই দর্শনটি মূলত রবীন্দ্রভাবাদর্শের ‘বিশ্বভারতী’র ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

মুজতবা আলীর উপন্যাসে আমরা এক বিষণ্ণ রোমান্টিকতা ও দার্শনিক হাহাকারের পরিচয় পাই। ‘শবনম’ উপন্যাসটি তাঁর সৃজনশীলতার এক অন্যরকম শিখর। এখানে তিনি ফারসি কবিতার মরমিয়াবাদ বা সুফিজমের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রেমজ আকাঙ্ক্ষাকে একীভূত করেছেন। শবনম ও মজনুন-এর প্রেম কোনো জৈবিক আকর্ষণের বৃত্তে বন্দি নয়, তা যেন এক আধ্যাত্মিক আরোহণের পথ। এই উপন্যাসে তিনি উদ্ধৃত করেছেন হাফিজ কিংবা খৈয়ামের রুবায়েত, যা কাহিনীর গভীরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি যখন লেখেন, “ভালোবাসা তো কেবল পাওয়া নয়, ভালোবাসা হলো নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক পবিত্র আনন্দ,” তখন সেখানে তাঁর সুফিবাদী দর্শনের এক অস্পষ্ট আভা ফুটে ওঠে। তাঁর অন্য দুই উপন্যাস ‘অবিশ্বাস্য’ এবং ‘শহরইয়ার’-এর মধ্যেও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং অনিশ্চিত জীবনের এক চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর উপন্যাসের কাঠামোতে প্রায়শই মিথ এবং সমসাময়িক বাস্তবতার মিশেল ঘটিয়েছেন। তাঁর লেখায় যে ‘ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি’ বা পাঠান্তরীয় সম্পর্কের প্রয়োগ দেখা যায়, তা আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এক ভাষার উপমা অন্য ভাষায় এনে তিনি যে ভাষাগত বৈচিত্র্য তৈরি করেছেন, তা বাংলা গদ্যকে এক অনন্য ঋদ্ধতা দান করেছে।

মুজতবা আলীর ছোটগল্প এবং রম্যরচনার জগৎটি আরও বেশি প্রাণবন্ত ও বিচিত্র। ‘চাচা কাহিনী’র চতুর ও মজলিশী চচরিত্রটি যেন খোদ লেখকেরই এক প্রতিচ্ছবি। চচার মুখ দিয়ে তিনি বিশ্বের নানা প্রান্তের গল্প, রাজনীতি, সমাজনীতি ও দর্শনকে পরিবেশন করেছেন এমন এক ঢঙে, যা পাঠককে হাসাতে হাসাতে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করে। তাঁর রম্যরচনাগুলো মূলত ‘কমিউনিকেটিভ রিজন’ বা যোগাযোগমূলক যুক্তির এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ। তিনি হাসির ছলে জীবনের চরম সত্যগুলো বলে দিতেন। ‘ময়ূরকণ্ঠী’ কিংবা ‘টুনি মেম’ গ্রন্থে তাঁর এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর হাস্যরসের পেছনে ছিল এক গভীর করুণা। তিনি জানতেন, মানুষের ত্রুটিগুলো চিরন্তন, তাই ঘৃণা নয় বরং ভালোবাসার স্পর্শেই সেই ত্রুটিকে উন্মোচন করা সম্ভব। মুজতবা আলীর সাহিত্যে ‘সিনক্রিটিজম’ বা সমন্বয়বাদী দর্শনের এক প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তিনি একই সঙ্গে পবিত্র কুরআন, উপনিষদ,  বাইবেল এবং গ্রিক দর্শনের নির্যাস গ্রহণ করেছেন। তাঁর লেখায় কখনো মহাকবি কালিদাসের শ্লোক আবার কখনো গ্যেটের কবিতার চরণ পাশাপাশি বসে গেছে এক অপূর্ব ছন্দে। এই যে বহুমুখী সংস্কৃতির মিলনমেলা, এটিই মুজতবা আলীকে অন্য সকল সমসাময়িক লেখক থেকে পৃথক করে দেয়।

তিনি বাংলা ভাষায় ‘আরবি-ফারসি-সংস্কৃত-ইংরেজি’র এক নতুন রসায়ন তৈরি করেছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর উত্তরসূরি হিসেবে তিনি গদ্যে বীরবলী রীতির উজ্জ্বলতাকে বজায় রেখেছিলেন, কিন্তু তাতে যোগ করেছিলেন নিজস্ব এক ‘অ্যনেকডোটাল’ বা কিসসা বলার ভঙ্গি। তাঁর গদ্য যেন এক বহমান নদী, যা কখনো তপ্ত মরুময় কাবুল দিয়ে বয়ে যায়, আবার কখনো শান্তিনিকেতনের শালবীথির ছায়ায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর শব্দচয়ন ছিল অত্যন্ত সচেতন। তিনি জানতেন কোন শব্দের পাশে কোন শব্দ বসলে বাক্যের সুষমা বৃদ্ধি পায়। তাঁর লেখায় আমরা দেখি, “গদ্য যখন কবিতা হয়ে উঠতে চায়, তখন তার চরণে চরণে বাজে এক অলৌকিক নূপুরধ্বনি।” এই নূপুরধ্বনিই মুজতবা আলীর গদ্যের প্রাণ। তাঁর রচনার মধ্যে এক ধরনের ‘পলিফোনি’ বা বহুস্বরতা কাজ করে। একই সঙ্গে তিনি যেমন একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত, তেমনি তিনি একজন সাধারণ মানুষের ঘরোয়া বন্ধু। এই যে দ্বৈত সত্তার মিলন, তা-ই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অসামান্য জনপ্রিয়তা।

মুজতবা আলীর সাহিত্যকর্মের আর একটি প্রধান দিক হলো তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবোধ। তিনি যখন ধর্ম নিয়ে আলোচনা করেন, তখন সেখানে কোনো গোঁড়ামি বা সংকীর্ণতা থাকে না। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে তাঁর যে গভীর জ্ঞান ছিল, তা তিনি ব্যবহার করেছেন মানুষের প্রতি মানুষের প্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তাঁর মতে, ধর্মের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, “মানুষের ধর্ম একটাই, আর তা হলো মনুষ্যত্ব। বাকি সব আবরণ মাত্র।” এই যে সার্বজনীনতা, এটিই তাঁর সাহিত্যের মূল প্রেরণা। তাঁর ‘পঞ্চতন্ত্র’ গ্রন্থে তিনি যখন সমাজের ভণ্ডামি এবং ধর্মীয় কুসংস্কারকে আঘাত করেন, তখন তাঁর কলম তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই তীক্ষ্ণতা কখনো শালীনতাকে লঙ্ঘন করে না। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন ‘এস্থেট’ বা নন্দনতত্ত্ববিদ। সৌন্দর্যের অন্বেষণই ছিল তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা। প্রকৃতি, নারী, স্থাপত্য কিংবা সুস্বাদু ভোজন সবকিছুর মধ্যেই তিনি এক ধরনের সৌন্দর্য ও শিল্পবোধ খুঁজে পেতেন। তাঁর ‘জলে ডাঙ্গায়’ গ্রন্থে জাহাজে ভ্রমণের যে বর্ণনা আমরা পাই, সেখানে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের চেয়েও লেখকের অন্তরের ঢেউগুলো যেন বেশি প্রাণবন্ত হয়ে ধরা দেয়।

সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব অপরিসীম। শান্তিনিকেতনে অবস্থানকালে তিনি বিশ্বকবির যে সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, তা তাঁর চিন্তাজগতকে এক বিরাট ব্যাপ্তি দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বমানবিকতা’র ধারণাটি মুজতবা আলী নিজের মতো করে আত্মস্থ করেছিলেন। তবে তিনি কেবল রবীন্দ্র-অনুবর্তী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক স্বাধীনচেতা স্রষ্টা। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাব্যময়তাকে গদ্যের যুক্তিনির্ভর কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে এক নতুন পথ তৈরি করেছিলেন। তাঁর সাহিত্যিক দর্শনে ‘হিউম্যানিজম’ বা মানবতাবাদ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মানুষই সকল সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। তিনি যখন জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন, তখন ইউরোপীয় দর্শনের যে নির্লিপ্ততা ও যুক্তিবাদ তাঁর মনে রেখাপাত করেছিল, তার প্রতিফলন আমরা দেখি তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর যে অস্থিরতা, তা মুজতবা আলীকে বিচলিত করেছিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন, এবং তাঁর লেখায় শোষিত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ সবসময়ই প্রকট ছিল।

মুজতবা আলীর লেখায় নারী চরিত্রগুলোও অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ‘শবনম’ থেকে শুরু করে তাঁর বিভিন্ন ছোটগল্পের নারীরা কেবল রক্তমাংসের মানবী নন, তাঁরা যেন এক একটি আদর্শিক প্রতীক। শবনমের মধ্যে যে আভিজাত্য, বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেমের মহিমা ফুটে উঠেছে, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি নারীকে দেখেছেন শ্রদ্ধার সঙ্গে, বন্ধুত্বের নিরিখে। তাঁর নারী চরিত্ররা কখনো অবলা নয়, বরং তারা জ্ঞানের দীপ্তিতে উজ্জ্বল এবং সাহসিকতায় অনন্য। মুজতবা আলীর এই যে নারীবাদ বা নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, তা অত্যন্ত আধুনিক এবং প্রগতিশীল। তিনি মনে করতেন, সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে নারীর ভূমিকা পুরুষের সমান্তরাল। তাঁর লেখায় নারীর যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা যেমন কাব্যিক তেমনি তা বাস্তবোচিত। তিনি কোনো কৃত্রিম অলংকারে নারীকে সাজাতে চাননি, বরং অন্তরের সৌন্দর্যকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

সাহিত্যিক শৈলী ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে উঠে মুজতবা আলী হয়ে উঠেছেন বাঙালির পরম আত্মীয়। তাঁর হাস্যরস বাঙালির একঘেয়ে যান্ত্রিক জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো শীতলতা এনে দেয়। তাঁর ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে যখন তিনি বলেন, “বই পড়ে যারা শুধু তথ্য আহরণ করে তারা হলো খনি শ্রমিক, আর যারা আনন্দ আহরণ করে তারা হলো মণি-মাণিক্যের জহুরি,” তখন আমরা বুঝতে পারি তিনি সাহিত্যের আনন্দময় সত্তার দিকেই ইঙ্গিত করছেন। তাঁর কাছে পাণ্ডিত্য ছিল জীবনকে উপভোগ করার একটি মাধ্যম মাত্র। তিনি কখনো জ্ঞানের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েননি, বরং জ্ঞানকে তিনি করেছেন সহজবোধ্য ও রসময়। তাঁর প্রতিটি রচনায় তিনি যেন পাঠকের সঙ্গে এক নিভৃত মজলিশে বসে আছেন যেখানে তামাকের ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে বিচিত্র চিন্তা, রেশমি সুতোর মতো বুনে যাওয়া হচ্ছে গল্পের জাল।

মুজতবা আলী ছিলেন চিন্তার স্বাধীনতার পক্ষে এক আপসহীন কণ্ঠস্বর। তিনি মনে করতেন, মনের জানলাগুলো খোলা রাখা উচিত যাতে পৃথিবীর সব প্রান্তের হাওয়া সেখানে প্রবেশ করতে পারে। তাঁর এই খোলা মনের পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও। তিনি তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং তাঁর শ্লেষাত্মক মন্তব্যের মাধ্যমে ক্ষমতাশালীদের ভণ্ডামিকে উন্মোচিত করতেন। কিন্তু তাঁর এই প্রতিবাদী রূপটি সবসময়ই এক শৈল্পিক সুষমার আবরণে ঢাকা থাকত। তিনি জানতেন, সরাসরি স্লোগান দেওয়ার চেয়ে সাহিত্যের ভাষায় সত্য বলা অনেক বেশি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী।

তিনি মূলত এক ‘অলিটর’ বা শ্রেষ্ঠ কথক। তাঁর গদ্যের মধ্যে এক ধরনের কথ্যরীতির প্রবাহমানতা রয়েছে যা পাঠককে সম্মোহিত করে রাখে। তিনি যখন কোনো গল্পের অবতারণা করেন, তখন তার সাথে জুড়ে দেন অসংখ্য প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গ, যা মূল কাহিনীকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। একেই বলা হয় ‘ডিগ্রেশন’ পদ্ধতি, যা বিশ্বসাহিত্যে লরেন্স স্টার্ন বা হেনরি ফিল্ডিংয়ের মতো লেখকরা ব্যবহার করেছেন। মুজতবা আলী এই পদ্ধতিকে বাংলা গদ্যে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছেন। তাঁর ডিগ্ৰেশন বা অবান্তর কথাগুলোই আসলে তাঁর রচনার প্রাণ। কারণ সেই অবান্তর কথার ভিড়েই লুকিয়ে থাকে দর্শনের মণিমুক্তো।

সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল প্রতিভা, যিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে। তিনি ছিলেন একজন সুফি, একজন পণ্ডিত, একজন ভ্রমণপিপাসু এবং একজন আজন্ম রসিক। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আজও অপূরণীয়। তবে তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে তিনি অমর হয়ে আছেন কোটি পাঠকের হৃদয়ে। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায় কীভাবে ঘৃণা বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসার সঙ্গে বিশ্বকে গ্রহণ করতে হয়। তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন এক একটি দীপশিখা, যা অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে মানুষের মনে জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেয়। মুজতবা আলী কেবল একজন লেখক নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন এবং একটি যুগ। তাঁর শব্দকল্পদ্রুমের ছায়াতলে দাঁড়িয়ে আজও আমরা খুঁজে পাই জীবনের সার্থকতা এবং সংস্কৃতির পরম আশ্রয়। তিনি ছিলেন সেই মহাজাগতিক পরিব্রাজক, যাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল মাটির পৃথিবীর ধূলিকণা থেকে কিন্তু যাঁর চিন্তা বিস্তৃত ছিল মহাকাশের নক্ষত্ররাজি পর্যন্ত। তাঁর এই বৈচিত্র্যময়, পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং অনন্য রসবোধে ভাস্বর জীবন ও সাহিত্য চিরকাল বাংলা ভাষাভাষী মানুষের পাথেয় হয়ে থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন, জীবনটা একটা উৎসব, আর সেই উৎসবকে উদযাপন করতে হয় জ্ঞান, প্রেম এবং হাসির অম্লমধুর মিশ্রণে। সৈয়দ মুজতবা আলী নামের সেই মহান শিল্পী তাঁর কলমের ডগায় যে ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করেছেন, তা মহাকালের স্রোতে কখনো ম্লান হওয়ার নয়। তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন এক ‘সত্যপীর’, যাঁর দরবারে আধুনিকতা ও ঐতিহ্য এসে হাত মিলিয়েছে এক অমোঘ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে। তাঁর সাহিত্যিক জীবন তাই কেবল অতীত নয়, বরং তা এক জীবন্ত বর্তমান এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

১৩৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন