কক্সবাজারে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি, শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি বাড়ছে
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬ ৬:২০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কক্সবাজারে মার্চ মাসে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত মোট ১০৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছলিম উল্লাহ জানান, ৩০ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩৩ জন শিশু, আর পরদিন নতুন করে ১২ জন শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল।
কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন মুহাম্মদ আলমগীর জানান, বছরে সাধারণত বসন্ত এবং বর্ষাকালে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, “বর্তমানে যে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে, তা মৌসুমি কারণে স্বাভাবিক হলেও এবার কিছুটা বেশি হওয়ায় আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।”
জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৩টি সন্দেহভাজন কেস শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে পরীক্ষার জন্য পাঠানো ২৮টি নমুনা পজিটিভ এসেছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে রামুর মিঠাছড়ি এলাকা এবং সদর উপজেলার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী এলাকায় সংক্রমণ বেশি।
স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর এবং শিশুদের অপুষ্টি সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ডা. আলমগীর জানান, “টিকাদানের আওতা সাধারণত ৯৫ শতাংশ হলেও কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের কারণে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।”
তিনি আরও জানান, ছিন্নমূল ও ঝরে পড়া শিশুদের মধ্যে টিকা না পাওয়া বা অপুষ্টির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এই কারণে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, “হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটি এলাকায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে।”
তিনি জানান, সাধারণত পাঁচ বছরের নিচের শিশু, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এবার অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সের আগে শিশুরা সংক্রমিত হচ্ছে, যা মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার জানান, উখিয়ায় বর্তমানে ২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি। গত এক মাসে ৭ থেকে ৮ জন রোহিঙ্গা শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।
হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি ওঠার আগেই রোগী অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্ব দিচ্ছে—আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মাস্ক ব্যবহার, নিয়মিত হাত ধোয়া, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো। ডা. নাজির বলেন, “যেসব এলাকায় টিকার কাভারেজ ৮৫ শতাংশের নিচে, সেখানে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বেশি। তাই দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।”
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর মৃত্যু ঘটেনি। তবে জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক জানান, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ২০টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি ৪ জন শিশু রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে ‘উঠান বৈঠক’, বাড়ি বাড়ি সচেতনতা কার্যক্রম এবং নজরদারি জোরদার করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১২৩ বার পড়া হয়েছে