জ্বালানি তেল সংকট: তেল সরবরাহে অস্থিরতা, বিকল্প উৎসের খোঁজে বিপিসি
মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬ ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হুলুস্থুল পড়েছে।
চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভিড় করছেন গ্রাহকরা; কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ লাইন। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়া কর্পোরেশন (বিপিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য প্রাথমিক আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমুদ্র পথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। মে মাসে ১৭টি জাহাজে সাড়ে ৩ লাখ টন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আমদানির সূচি নির্ধারণ করা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এ ব্যাপারে চুড়ান্ত মতামত প্রদান করেনি।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২৩ মার্চ সোমবার পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন, যা দিয়ে মাত্র ১৪ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এছাড়া অকটেনের মজুত আছে ১১ হাজার টন, পেট্রোল ১৬ হাজার ৬০৫ টন। ফার্নেস অয়েলের মজুত আছে ২৯ দিনের এবং জেট ফুয়েল আছে ২৩ দিনের।
এদিকে, দেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একমাত্র পরিশোধনাগার ইষ্টার্ণ রিফাইনারিতে এখনো প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন মজুত আছে। অপরিশোধিত তেল দিয়ে আরও ১৭–১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। এর মধ্যে নতুন চালান না এলে উৎপাদন ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরু করার পর, ইরান পাল্টা ব্যবস্থাস্বরূপ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এতে জ্বালানি বাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশেও জ্বালানি খাতে চরম অস্থির পরিবেশ তৈরি হয়। এরফলে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিপর্যয় নেমে আসে।
বিপিসি আশা করছে, ভারত থেকে পাইপলাইনে আসা তেল এবং এপ্রিল মাসে পরিকল্পিত আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির উপর।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় বাংলাদেশে। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ অপরিশোধিত। এসব তেল আমদানিতে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রধান উৎস।
আমদানি করা এসব অপরিশোধিত তেল রাষ্ট্রীয় কারখানা ইষ্টার্ণ রিফাইনারিতে পরিশোধ করে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হয়। ইষ্টার্ণ রিফাইনারিতে গড়ে প্রতিদিন ৪ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। এই মজুত দিয়ে আরও ১৭–১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। উৎপাদিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ কৃষি সেচ, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত ক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ২৪ হাজার টন। কিন্তু বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা মোট মজুতের ২৯ শতাংশ। এছাড়া অকটেন মজুত রাখার ক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন; বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন। পেট্রোল মজুত রাখার ক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন; বর্তমানে মজুত আছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন।
বিপিসি একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর, চলতি মাসের ১ মার্চ থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত গড়ে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন। গড়ে প্রতিদিন বিক্রি হয়েছে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। এর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালে বিক্রি হয়েছিল গড়ে সাড়ে ১২ হাজার মেট্রিক টন।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং তাদের সিডিউল অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে না পারায় তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত থেকে পাইপলাইনে ১০ হাজার টন তেল এসেছে, আর এ মাসে আরও ৫ হাজার টন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানাচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে বাড়তি দামে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
১২২ বার পড়া হয়েছে