ডেট লাইন কুমারখালী
শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬ ৮:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমার বন্ধু মহলে বিশেষ করে কর্মসূত্রে যেসব বন্ধুদের সংস্পর্শে এসেছি কুমারখালী নামটি তাদের অনেক পরিচিত মনে হয়, যা অনেকেই আমাকে বলেছেন বিভিন্ন সময়ে।
কুমারখালীতে এলে আমি নিজেকে সেই শৈশব কৈশোর জীবনে নিয়ে যাই। এখনকার তরুণদের কাছে যা বোঝানো যাবে না।।
আমাদের বেড়ে ওঠার মধ্যে রয়েছে স্কুল জীবন পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিক এবং পরবর্তী শিক্ষা কাল।
আমাদের স্কুলে একবার এক পুরস্কার বিতরণী সভায় এলেন তখনকার কুষ্টিয়ার সদর মহকুমার এসডিও সাহেব। স্বাভাবিকভাবেই নাম মনে থাকার কথা না।
যখন উনার কাছে পুরস্কার গ্রহণ করছি এবং আমাকে একটা ছোট্ট ডিকশনারি দেয়া হলো তা দেখে তিনি বললেন খুবই মূল্যবান পুরস্কার তোমার কাজে লাগবে।
অবশ্য আমি সারা জীবনই ডিকশনারি কম ঘেঁটেছি এবং সেই কারণে ভোকাবুলারি জানার সংখ্যা আমার খুবই কম। কোনরকম কাজ চালিয়ে যেতে পারি।
সার্কেল অফিসার ডেভেলপমেন্ট সেই সময়ে ছিলেন থানার প্রধান কর্মকর্তা। ১৯৬৫ সনের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে একজন সার্কেল অফিসার ডেভেলপমেন্ট ছিলেন নামটা ভুলে গেছি, তিনি জনগণকে চাঙ্গা রাখার জন্য প্রায়ই সভা-সমাবেশ করতেন। শহরে বেশ কয়েকটি বড় বড় শোভা যাত্রা হয়েছিল। এমনই একটি সমাবেশে আমি কুমারখালী জে এন হাইস্কুলের উপরের তলায় উপস্থিত ছিলাম। আমার মনে আছে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক পন্ডিত কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী সেখানে বক্তৃতা করেছিলেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তিনি সবাইকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আমাদের সময়ে পঞ্চম শ্রেণী ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পরীক্ষা হত। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণীতে যারা বৃত্তি পেতেন তাদের গলায় ফুলের মালা দিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে শহর ঘোরানো হতো। আমরা ১৯৬৮ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় একযোগে ছয় জন বৃত্তি পেয়েছিলাম। এরা হচ্ছেন নুরুজ্জামান, মনজুর রহমান, আব্দুল মতিন, আসাদুর রহমান, অসীম কুণ্ড ও আমি কাজী আখতার।
শহরের প্রধান রাস্তা দিয়ে আমাদের শোভাযাত্রা থানায় পৌঁছুলে তখনকার ওসি সাইদুর রহমান সাহেব আমাদের অভ্যর্থনা জানান। তিনি আমাদেরকে ৫ টাকা উপহার দেন যাতে আমরা মিষ্টি খেতে পারি।
অনেক কিছু ভুলে গেলেও এই ব্যাপারটা আমার মনে আছে।
সেই সময়ে ফুলের মালা গলায় দিয়ে আমাদেরকে যে শোভাযাত্রা সহকারে শহর প্রদক্ষিণ করা হয়েছিল সাম্প্রতিককালে আমার এক ফেসবুক ফ্রেন্ড একজন ভদ্রমহিলা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তার পিতার চাকরি সুবাদে ওরা কুমারখালীতে ছিলেন তখন। বাড়ির জানালা দিয়ে উনি এই দৃশ্য দেখেছিলেন।
আমার ওই বন্ধুদের মধ্যে নুরুজ্জামান মারা গেছেন অনেক আগেই। মনজুর রহমান শুনেছি কুষ্টিয়াতে সিনিয়র অ্যাডভোকেট। আব্দুল মতিন এর খবর জানিনা। অবশিষ্টদের সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা আছে।
অসীম ও আমি এখন পর্যন্ত যোগাযোগের মধ্যেই আছি।
আজ সকালে রফিক সহ বেরিয়েছিলাম প্রথমে গেলাম
বাটিকা মারাতে কবি মরহুম সৈয়দ আব্দুস সাদিক এর বাড়ি তবুও বসবাস এ। দুলারি ভাবি বাসায় ছিলেন না। সেখান থেকে গেলাম মুত্তালিব স্যারের বাসায়। স্যার কেউ পেলাম না তিনি গেছেন মাগুরাতে বড় ছেলে আব্দুল্লাহিল কাফির ওখানে।
শেষে বড়ুরিয়ার দিকে গেলাম। মামাতো ভাই ঝন্টু এবং অন্যান্যরা ছিলেন।
বড়ুড়িয়া এখন আর গ্রাম নেই। কুমারখালী পৌরসভা কে সম্প্রসারণ করে এই গ্রামটি এখন অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অনেক বড় বড় বাড়ি গড়ে উঠেছে।
অবশ্য অনেকেই মনে করেন পৌরসভায় অন্তর্ভুক্ত হলে ট্যাক্স বেড়ে যাবে। যেমন দুর্গাপুর এখনো পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ওরা নন্দলালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
আবার লালনের ছেঁউরিয়া কুষ্টিয়া শহরের মধ্যে হলেও এটি কুমারখালী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত।
আব্দুল মুত্তালিব স্যার গ্রাজুয়েট হবার পরপরই ১৯৬৩ সনে কুমারখালী এমএন হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তখন হেডমাস্টার ছিলেন কোমরকান্দি গ্রামের ডক্টর শেখ শাহাদত আলী।
ডক্টর শেখ শাহাদত আলী পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই ই আর এর প্রফেসর হয়েছিলেন।
উনার সময়েই কুমারখালী এমএন হাইস্কুলের জায়গা জমি কেনা হয়।
সে সময় আমাদের এম এন হাই স্কুলের লাইব্রেরীর জন্য বেশ কিছু বই কেনা হয়েছিল। বহুদিন ওইগুলো আমাদের বাড়িতে ছিল। আমি ওখান থেকে অনেকগুলো বই পড়ে ফেলি। আমার একজন গৃহ শিক্ষক ছিলেন তখন নাম শ্রী সুনীল বরণ ভট্টাচার্য।
তিনি পৌরসভা তে ট্যাক্স দারোগার চাকরি করতেন। ১৯৭১এ ভারতের যাবার পর আর ফিরে আসেননি।
তিনিও আমাদের পড়াতে এসে ওই বইগুলো থেকে অনেক বই পড়েন। এর মধ্যে সতীনের ঘর বইটি তার খুব প্রিয় ছিল।
উনার কাছেই আমি প্রথম শুনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুইজন খুব বড় মাপের কবি। এটা হয়তো আমি আগেও কোথাও লিখেছি। আমি একদিন ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম পৃথিবীর মধ্যে বড় ?
উনি আমাকে বললেন হ্যাঁ।
বলা বাহুল্য বহুদিন ধরে আমি এই ধারণাই লালন করতাম।
কুমারখালী পাবলিক লাইব্রেরী টি এই অঞ্চলের মধ্যে একটি অতি প্রাচীন লাইব্রেরী। চিরন্তনই পাঠাগার, ইকবাল লাইব্রেরি ইত্যাদি নাম ধারণ করে পরবর্তীকালে ১৯৬১ সালে চূড়ান্তভাবে কুমারখালী পাবলিক লাইব্রেরির যাত্রা শুরু হয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এটাই ছিল আমাদের বসার জায়গা। মীর আমজাদ আলী ভাই ও আমি এক সময়ে এই লাইব্রেরীর জন্য অনেক চিন্তাভাবনা করেছি এবং এর অবকাঠামাগত উন্নয়নের ব্যবস্থাও আমরা করেছিলাম।
আমি অবশ্য সরাসরি নই ; সরকারিভাবে আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা ভূমিকা রেখেছিলাম।
দুঃখের বিষয় আমাদের পরমপ্রিয় এই লাইব্রেরীতে এখন পাঠক নেই বললেই চলে। প্রতিদিন খোলা হয় কিনা এটাও আমি নিশ্চিত নই। যুগের ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল যুগে এবং ইন্টারনেটের অতিশয় আক্রমণের মুখে লাইব্রেরীগুলো মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে।ভেবে ভেবে খারাপই লাগে।
বাড়িতে মায়ের সঙ্গে গল্প করে কাটানোর চেষ্টা করি। মা সবই বুঝতে পারেন কিন্তু কথাবার্তায় আগের মত স্বতঃস্ফূর্ততা নেই। বয়সের কারণে উনি অনেকটাই নির্জিব হয়ে পড়তে যাচ্ছেন। বেশিক্ষণ কথা বলা ভালো লাগেনা খুব সম্ভবত। সন্তানদের দেখা হলেই জিজ্ঞেস করেন, তোর খাওয়া হয়েছে! উনিও এখনো মনে করেন তার অমুক সন্তান কিংবা নাতি বোধহয় এখনো খায়নি।
দৈনিক পত্রিকা পড়ছি না টেলিভিশন এর সামনেও কমই বসছি। ফেসবুকে দেখলাম কেউ একজন লিখেছেন আরব রাষ্ট্র সমূহ ( সৌদি আরব সহ।)
আল্লাহর চেয়ে আমেরিকাকে বেশি ভয় পায়। নাউজুবিল্লাহ।
লেখক: সাবেক সচিব।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২২ বার পড়া হয়েছে