বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তা: চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬ ২:২৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণ আজ আর কেবল একটি সামাজিক আলোচনা নয়; এটি একটি বাস্তব ও শক্তিশালী উন্নয়ন সূচক। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও গত এক দশকে নারী উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। তবে এই অগ্রযাত্রা যতটা আশাব্যঞ্জক, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তার উত্থান মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। হস্তশিল্প, বুটিক ব্যবসা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও সেবা খাতে নারীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ অনেক নারীর আত্মনির্ভরশীলতার পথ সহজ করেছে।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু বাস্তব সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা। নারী উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়নের অভাব। ব্যাংক ঋণ পেতে গেলে জামানত, ব্যবসায়িক ইতিহাস ও বিভিন্ন জটিল শর্ত পূরণ করতে হয়, যা অধিকাংশ নারীর পক্ষে সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পরিবার বা সমাজ স্বীকৃতি দেয় না। ফলে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রাথমিক ধাপেই অনেকে থেমে যান।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা। যদিও সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করছে, তবুও এসব উদ্যোগ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীরা পিছিয়ে পড়ছেন। আধুনিক ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং, হিসাবরক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার অভাব নারীদের প্রতিযোগিতায় দুর্বল করে তোলে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা এখনো একটি বড় বাস্তবতা। আমাদের সমাজে নারীর প্রধান দায়িত্ব হিসেবে এখনো পরিবার ও গৃহস্থালির কাজকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে একজন নারী যখন উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তখন তাঁকে পরিবার, সমাজ এমনকি আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় নারীর সাফল্যকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যা তার মানসিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এ ছাড়া নিরাপত্তা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত, মিটিং, সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ—এসব ক্ষেত্রে নারীরা প্রায়ই অনিরাপদ বোধ করেন। এই বাস্তবতা তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করে।
তবে এত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তারা হার মানছেন না। তারা প্রমাণ করছেন যে সাহস, পরিশ্রম ও সঠিক সহায়তা পেলে নারীরাও অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারেন। আজ অনেক নারী উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেননি, বরং অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন একটি ব্যক্তিগত সাফল্য থেকে সামাজিক পরিবর্তনে রূপ নিচ্ছে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নারীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে। নারী উদ্যোক্তা তহবিল, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, স্টার্টআপ সহায়তা, ব্যাংকের বিশেষ ঋণ স্কিম—এসব উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন চেম্বার, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নারী উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তা শিক্ষা যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে নারীরা ছোটবেলা থেকেই ঝুঁকি নেওয়া, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী চিন্তায় অভ্যস্ত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইনকিউবেশন সেন্টার, স্টার্টআপ ল্যাব ও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; এটি একটি সামাজিক রূপান্তরের প্রতিফলন। একজন নারী যখন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তখন তিনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, সন্তানদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে পারেন এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন। এর ফলে দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন আরও সহজ হয়।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের পথচলা এখনো সংগ্রামমুখর হলেও সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—নীতিনির্ধারক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত ও সমাজের সম্মিলিত সহযোগিতা। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে তারা শুধু নিজেদের জীবন নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে সক্ষম হবেন। নারীর ক্ষমতায়ন তখন আর কেবল স্লোগান নয়, বরং বাস্তব উন্নয়নের শক্ত ভিত্তিতে পরিণত হবে।
লেখক:
সহযোগী অধ্যাপক
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
১৩৮ বার পড়া হয়েছে