রাতের অন্তিম ভোর
মঙ্গলবার, ১০ মার্চ, ২০২৬ ৬:২৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাতের শেষে যে ভোর—
রাতটা আজ অদ্ভুত নিস্তব্ধ।
মনটা খুব খারাপও নয়, আবার খুব ভালোও নয়—এক ধরনের মাঝামাঝি অনুভূতি।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কিছু একটা খাই। কিন্তু এত রাতে কী খাওয়া যায়!
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতর নিঃশব্দ অন্ধকার।
দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, আর মাঝে মাঝে বাতাসে গাছের শুকনো পাতা পড়ার হালকা শব্দ—
এইটুকুই রাতের সঙ্গী।
বাড়ির সকলের ভাবনা আর আমার ভাবনা এক নয়।
সবার নামাজ, পড়াশোনা আর খাওয়া-দাওয়া শেষ মানেই তাদের রাতের কাজ শেষ।
তারপর ঘুমই তাদের একমাত্র কাজ।
কিন্তু আমার!
রাত যেন তখনই শুরু হয়।
বাড়ির সবার সবকিছু ঠিক আছে কি না,
গেটের তালাগুলো দেওয়া হয়েছে কি না,
সেটা নিশ্চিত করা যেন আমারই দায়িত্ব।
দায়িত্বটা একেবারে ছোট নয়।
তাই সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পরেও ঘুরে ঘুরে দেখি—
কার দরজাটা খোলা, কার জানালায় বাতাস ঢুকছে, কার কম্বলটা সরে গেছে।
সব দেখে তারপর ধীরে ধীরে নিজের বিছানার দিকে যাই।
কিন্তু বিছানায় গেলেই যে ঘুম আসবে, তা আর হয় না।
আগের মতো রাত আর আমাকে মুগ্ধ করে না।
ঘুম আসার আগেই রাত শেষের দিকে গড়িয়ে পড়ে।
তবু মাথার ভেতর একের পর এক ভাবনা ঘুরপাক খায়।
কালকের সকালটা কেমন হবে?
ভোরের আলো পুরোপুরি ফুটার আগেই
গেটের সামনে কিছু মানুষের আনাগোনা শুরু হবে।
খুব চেনা মুখ। বেশির ভাগই হতদরিদ্র আর অসহায় মানুষ তারা।
সামনে ঈদ। কিন্তু তাদের সবার চাওয়া এক নয়।
কেউ একটা শাড়ির কথা বলবে।
কেউ বলবে—একটা লুঙ্গি হলে ভালো হয়।
কারও দরকার একটা পাঞ্জাবি।
কেউ বলবে—নগদ কিছু টাকা হলেই চলবে।
কেউ আবার বলবে—ওষুধ কেনার টাকা দরকার।
এমন চাওয়ার যেন শেষ নেই!
তাদের সবার কথাগুলো মন দিয়ে শুনি। কিছু দেওয়া হোক বা না হোক।
কারণ তারা তো সারাবছর আসে না।
একথা তারা প্রায়ই বলে—
সারাবছর তো আর আসি নাই বাবা…
এখন একবারে যা হয় দিও!
ও-বাবা কবে আসবো!
অসহায় মানুষদের মুখ থেকে বার বার আসবে এমন প্রশ্ন—
আর কি উত্তর দিবো তাদের!
এই কথাগুলোই মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে রাতে।
তাই ক্লান্তি থাকলেও ঘুম দূরে সরে যায়।
ঠিক এমন সময় বালিশের পাশে রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল।
রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে এক পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো—
কেমন আছেন ভাই?
সবমিলিয়ে কেমন চলছে? ঈদের প্রস্তুতি কেমন?
তখনো বলার সুযোগ হয়নি আমার। তাই
আমি চুপচাপ শুনে যাচ্ছি।
ওপাশের মানুষটা অনেক দূরে—বিদেশে।
তবু দেশের খবর রাখেন অবাক করার মতো।
তিনি বললেন—
আমরা ভাই বিদেশে থাকি।
কিন্তু সব খবর পাই। অনলাইনের যুগ—কিছুই লুকানো থাকে না।
আপনাদের এলাকার পশুর খবরও জানি, পাখির খবরও জানি।
ভালোও জানি, মন্দও জানি।
তারপর একটু থেমে বললেন—
ভাই সরকারের কি অবস্থা, কি বুঝছেন!
ঠিক মতো পারবে কি! এই সরকার?
সরকার যদি মানুষের মন জয় করতে চায়,
তাহলে চাঁদাবাজ আর সন্ত্রাসীদের ধরতে হবে।
নিজের লোক হলেও, পরের লোক হলেও ধরতে হবে।
কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।
আর দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে শক্ত হাতে।
তখনো শুনছি তার কথা—
কেমন যেন ক্লান্তির সঙ্গে তার কণ্ঠে এক ধরনের অভিমানও মিশে ছিল।
তিনি বললেন—
আমরা এখানে কাজ করি ভাই,
এই দেশের সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে থাকতে হয় এখানে।
তারপর অবশিষ্ট টাকা পাঠাই নিজের দেশে।
সেই টাকায় আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঈদের কেনাকাটা করে।
উৎসব পালন করে আনন্দ চিত্তে।
কিন্তু দেশে গেলে দেখি—
অনেকের দৃশ্যমান ব্যবসা-বাণিজ্য নেই।
তবু তারা চাঁদাবাজি, ধান্ধাবাজি আর অনিয়ম-দুর্নীতির টাকায় রমরমা ঈদ করে।
রাতের নিস্তব্ধতার ভেতর কথাগুলো আরও ভারী হয়ে উঠল।
আমরা তো ভাই এমন দেশ চাই না।
আমরা চাই—মানুষ কোথাও ঠকবে না এমন দেশ।
তারপর তিনি আবার বললেন—
এখানে কাজ দেরি হলে সমস্যা নেই।
কিন্তু কাজটা নিখুঁত হতে হবে। কাজ ঠিক না হলে কেউ টাকা পায় না।
আমাদের দেশেও যদি নিয়মটা ঠিকমতো চালু হত!
শুনলাম—হাঁটার সময় জুতা-স্যান্ডেলের ঘষাঘষিতে রাস্তার খোয়া উঠে যাচ্ছে!
শুনেছেন না-কি ভাই!
হঠাৎ কথার গতি থেমে গেল।
ঠিক আছে ভাই…
আমার তো রাত শেষ হয়ে গেছে।
আপনারও তো সেহরির সময় হয়ে গেছে। খেয়ে নেন। পরে কথা হবে।
ফোনটা কেটে গেল।
আমি কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকলাম।
রাত প্রায় শেষ।
আকাশের গাঢ় অন্ধকার একটু একটু করে হালকা হচ্ছে।
আর একটু পরেই সেহরি।
তারপর ভোর হবে।
আর সেই ভোরের আলো ফুটতেই গেটের সামনে জড়ো হবে কিছু মানুষ—
তাদের আশা, তাদের প্রয়োজন আর ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে।
হয়তো তাদের সবার চাওয়া পূরণ করা সম্ভব হবে না।
তবু তাদের কথাগুলো শুনতে হবে।
কারণ পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় অভাব সব সময় টাকার নয়।
অনেক সময় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়—
তার কথা কেউ মন দিয়ে শোনুক।
আর সেই শোনার অপেক্ষাতেই হয়তো
প্রতিটি ভোরের আগে একটি দীর্ঘ রাত জেগে থাকে।
১৩০ বার পড়া হয়েছে