সুন্দরবন সংরক্ষণে পশ্চিম বন বিভাগের তৎপরতা বৃদ্ধি
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ ৮:৩৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন সংরক্ষণে পশ্চিম বন বিভাগ ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে।
সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান সম্পদ বৃক্ষরাজি সংরক্ষণের পাশাপাশি হরিণসহ অপ্রধান বনজদ্রব্য যেমন মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা রক্ষণাবেক্ষণে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সম্প্রতিক সময় সুন্দরবনে অবৈধভাবে হরিণ শিকার, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, পারশে মাছের পোনা সংগ্রহ, গোলপাতা নিধন ও জেলে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে পশ্চিম বন বিভাগ অর্থ পুরস্কারের ঘোষণাও করেছে।
সুন্দরবনের মোট আয়তন ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশে এবং বাকিটা ভারতে অবস্থিত। ২০০১ সালে বাংলাদেশে পশ্চিম বন বিভাগ ও পূর্ব বন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পশ্চিম বন বিভাগের সদর দপ্তর খুলনায় এবং পূর্ব বন বিভাগের সদর দপ্তর বাগেরহাটে অবস্থিত।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের ভৌগোলিক আকার ও প্রশাসনিক কাঠামো
পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন সুন্দরবনের মোট আয়তন ৩,৫৭৩.২৮ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ২,০৭২.২৪ বর্গ কিলোমিটার এবং বাকিটা সাতক্ষীরা জেলাধীন।
পশ্চিম বন বিভাগের আওতায় রয়েছে:
২টি রেঞ্জ (খুলনা ও সাতক্ষীরা)
৯টি স্টেশন
২৮টি টহল ফাঁড়ি
মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতার লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে:
মাছ: জুন, জুলাই ও আগস্ট ব্যতীত সারা বছর পারমিট দেওয়া হয়।
কাঁকড়া: জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, জুন, জুলাই, আগস্ট ব্যতীত সারা বছর পারমিট পাওয়া যায়।
মধু: শুধুমাত্র এপ্রিল ও মে মাসে অনুমোদিত।
গোলপাতা: জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত পারমিট পাওয়া যায়।
বিস্তীর্ণ সুন্দরবনে ১৩টি নদী ও ৪৫০টি ছোট-বড় খাল রয়েছে। সব স্থানে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও জেলেরা নদীর মোহনা ও খালে ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ ঘন মশারি জাল ব্যবহার করে পারশে মাছের পোনা সংগ্রহ করে।
একটি পারশে মাছের পোনা আহরণের বিপরীতে ১১৯টি চিংড়ি, ৩১২টি প্রাণীকণা ও ৩১টি অন্যান্য মাছ ধ্বংস হয়। সুন্দরবনে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পারশের পোনা শিকারী দল বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দাদন নিয়ে পোনা শিকার করে।
বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার
সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে ও নদীতে প্রায় ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ রয়েছে। এর মধ্যে ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী আছে।
অধিক মুনাফার জন্য কিছু অসাধু জেলে বৈধ পাস পারমিট নিয়ে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করে। জেলেদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভাটার সময় এক পাশে জাল পেতে অন্য পাশে বিষ দেওয়া হয়। বিক্রিয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যে মাছ ছটফট করতে থাকে। এই কাজে ব্যবহৃত হয় রিপকট, ক্যারাটে, হিলডন, ওস্তাদ ও বিষ পাউডার। সম্প্রতি এদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
হরিণ শিকার প্রতিরোধ
সুন্দরবনের হরিণ শিকার প্রতিরোধে স্টেশন ও টহল ফাঁড়ি তৎপর। ২০২৫ সালে:
খুলনা রেঞ্জ থেকে ৯৬০টি হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার
সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে ৩৭৩টি ফাঁদ উদ্ধার
হরিণের মাংস: খুলনা রেঞ্জ ১,০৫০ কেজি, সাতক্ষীরা রেঞ্জ ১৯৬ কেজি
গ্রেফতারকৃত আসামি: খুলনা রেঞ্জ ৯৭ জন, সাতক্ষীরা রেঞ্জ ১২ জন
প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা ও মামলাসমূহ
জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধ। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী:
১১৬টি মামলা, ১২৪ জন জেলে আটক
খুলনা রেঞ্জে: ২৭টি পিওআর মামলা, ৩৪টি ইউডিওয়ার মামলা, ১টি সিওআর মামলা
জব্দকৃত সামগ্রী: ১টি ইঞ্জিন চালিত ট্রলার, ৬৩টি নৌকা, ৪টি মোটরসাইকেল, ১৬ কেজি হরিণের মাংস, ৬৩৯ কেজি চিংড়ি, ৩৫ কেজি শুটকি চিংড়ি, ১৯০ কেজি কাঁকড়া, ৬০০টি হরিণের ফাঁদ, ১৪টি বিষের বোতল
বনদস্যু ও জলদস্যু কার্যক্রম
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সুন্দরবনে বনদস্যুর পুনরুত্থান ঘটে। প্রায় ২০টি সক্রিয় ডাকাত দল নিয়ন্ত্রণ করছে। এরা জেলে, পর্যটক অপহরণ, নৌযান আটক, মুক্তিপণসহ নানা অপরাধ করছে।
কোস্ট গার্ড সম্প্রতি ৩০টি অভিযান পরিচালনা করে:
৫টি ডাকাত দল নিষ্ক্রিয়
৩টি দল আত্মসমর্পণ
উদ্ধার: ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২টি বোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরীর সরঞ্জাম, ৪২৮ রাউন্ড কার্তুজ, ৫২ জন বন্দী
নতুন সংরক্ষণ উদ্যোগ
খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন:
হরিণ শিকারে ব্যবহৃত ফাঁদ উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা
গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা
কমিউনিটি পেট্রোল গ্রুপ (সিপিজি) মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমানো
বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার প্রতিরোধে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা
নতুনভাবে গোলপাতা সংরক্ষণের পারমিট বন্ধ
উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ঢাকা চক্রের জড়িতদের সতর্ক করা।
এসব পদক্ষেপের ফলে সুন্দরবনের অপরাধ প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
১৩৮ বার পড়া হয়েছে