সংগ্রাম থেকে সাফল্য: পাবনার নারী উদ্যোক্তা অনুজা সাহা এ্যানির অনন্য পথচলা
রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬ ৯:৫৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পাবনার নারীরা এখন আর শুধু সংসার সামলানোতেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কঠোর পরিশ্রম, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে অনেক নারী আজ সমাজে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করছেন এবং অন্য নারীদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছেন। তেমনই এক সংগ্রামী নারী উদ্যোক্তা হলেন পাবনার অনুজা সাহা এ্যানি।
পাবনার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেলিম নাজির উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অমূল্য সাহা ও অঞ্জনা সাহার একমাত্র সন্তান অনুজা সাহা। বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের একমাত্র মেয়েকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই অনুজা নৃত্য ও সঙ্গীতে বেশ পারদর্শী ছিলেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি অর্জন করেন অসংখ্য পুরস্কার ও সনদ।
অনুজা জানান, এইচএসসি পাস করার পর হঠাৎ করেই তার বিয়ে হয়ে যায়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়, যার নাম রাখা হয় অর্ণব। কিন্তু স্বামীর ব্যবসায়িক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় সংসারে নেমে আসে অর্থনৈতিক সংকট। কঠিন সেই পরিস্থিতিতে অনুজা দিশেহারা হয়ে পড়লেও হাল ছাড়েননি। এরই মধ্যে তিনি পাবনার সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
তার বাবা অমূল্য সাহা একজন শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছেন। তার অনেক প্রিয় ছাত্র দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে চাকরি করলেও অনুজা নিজে দীর্ঘ চেষ্টা করেও কোনো চাকরি পাননি। পরে পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন নারী উদ্যোক্তার সফলতার গল্প পড়ে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং চাকরির আশা ছেড়ে ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমদিকে অনুজার মা অঞ্জনা সাহা মেয়ের ব্যবসা করার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু সংসারের কঠিন বাস্তবতা দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি মেয়েকে সমর্থন দেন। যেহেতু তার মা একজন দক্ষ রাঁধুনি ছিলেন, তাই খাবারের ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মায়ের সহযোগিতায় স্বল্প পুঁজি নিয়ে ছোট পরিসরে চালু করা হয় হোম ডেলিভারি খাবারের ব্যবসা—“অর্ণব এন্ড কোং”।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারি আইটেম, সাদা ভাত, বিরিয়ানি সহ নানা ধরনের খাবার পাবনার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ব্যবসার সুনাম ও পরিসর বাড়তে থাকে, পুঁজিও বৃদ্ধি পায়।
এখানেই থেমে থাকেননি অনুজা। তিনি বিসিক, যুব উন্নয়ন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পরে একটি বুটিক হাউস ব্যবসাও শুরু করেন। পাশাপাশি নৃত্য ও সঙ্গীতে দক্ষ হওয়ায় তিনি “মন ময়ূরী” নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখানে শিশুদের আর্ট, নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি ও সুন্দর হাতের লেখা শেখানো হতো।
বর্তমানে তিনি পাবনা শহরের জেলা পরিষদ সংলগ্ন একটি মার্কেটে “মায়ের পরশ” নামে একটি খাবারের হোটেল পরিচালনা করছেন। এখানে সকালে মাত্র ১০ টাকায় রুটি, পরোটা, সবজি ও ডালের নাস্তা পাওয়া যায়। দুপুর ও রাতে মাত্র ১০০ টাকায় উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় লুচি, আলুর দম, পাপড়ি চাটসহ নানা মুখরোচক খাবার পরিবেশন করা হয়।
বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দেড়শ’ টাকায় আনলিমিটেড কাচ্চি বিরিয়ানির অফার স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
স্থানীয়দের মতে, অনুজা সাহার মতো সংগ্রামী নারী উদ্যোক্তারাই একদিন শুধু পাবনা নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
১৪৪ বার পড়া হয়েছে