যুদ্ধ নয়; চাই শান্তির বার্তা
বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ ৬:২৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পুরো মধ্যপ্রাচ্য যেন অগ্নিগর্ভ। যুদ্ধের ময়দান। হামলা-পাল্টা হামলা চলছেই। চলছে মৃত্যুর হোলিখেলা। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সবাই বসবাস করছেন চরম আতংকের মধ্যে।
যেন মৃত্যু সবসময় তাড়া করে ফিরছে দেশগুলোর বাসিন্দাদের। ব্যাপক বোমা বর্ষণের শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে রাজধানী তেহরানসহ ইরানের অন্যান্য প্রদেশ। বাহরাইন, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, তুরষ্ক-বাদ যাচ্ছে না কোনো দেশ।
সবশেষ খবর হলো- তুরষ্কে হামলা চালিয়েছে ইরান। এছাড়া, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি দূতাবাসে হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায় ও শোক অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী বুধবার রাতে তিন দিনব্যাপী এই শেষ বিদায় ও শোক অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ছিল।
যুদ্ধের পঞ্চম দিনেও ইরানের রাজধানী তেহরানে ব্যাপক বোমা বর্ষণ চালিয়েছে অনিয়ম আর আগ্রাসনকে নিয়ম বানানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আপাতত রক্তের এই হোলিখেলা বন্ধের আশা করাটাও যেন বোকামি হবে। কারণ, মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময় এখন পার হয়ে গেছে, এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইরানের সঙ্গে যে যৌথ যুদ্ধ করছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র, সেটি ৮ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এমন পূর্বাভাস দিয়েছেন। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের পঞ্চম দিনে ইরানে নিহতের সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। বুধবার তেহরানসহ ইরানের পবিত্র শহর কোম, ইসফাহান এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন নিরাপত্তা স্থাপনায় ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
খামেনি নিহতের পর থেমে নেই ইরানও। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে দেশটি ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’ শুরু করেছে। এই অভিযানের আওতায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ইসরায়েলি স্থাপনা ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে তেহরান। ইরানও পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় রাস তানুরায় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। সৌদি আরামকোর বৃহত্তম পরিশোধনাগার ওই স্থাপনায় রয়েছে। বুধবার সকালের দিকে সেখানে আবারও ড্রোন হামলা হয়েছে।
এদিকে, ইরান থেকে তুরস্কের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে আঙ্কারা। তবে ওই ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। আর লেবাননে ইরানি দূতাবাসে কোনও ধরনের হামলা হলে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের সব দূতাবাসকে নিশানা করে হামলা চালানো হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। বুধবার দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল শেকারচি এই হুমকি দিয়েছেন। সঙ্গতকারণেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার মার্কিন নাগরিক মধ্যপ্রাচ্য ছেড়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরো জানান, বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মার্কিন নাগরিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে যে নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে ঢাকা। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানে ওয়াশিংটনকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। বুধবার (৪ মার্চ) মার্কিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অবস্থান জানানো হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে দুজন বাংলাদেশি মারা গেছেন, সাতজন আহত হয়েছেন। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত বা বিস্তৃত হয়, তবে বাংলাদেশের মতো দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান করা হোক।
শান্তিকামী মানুষ হিসেবে আমরা আর যুদ্ধ আর প্রাণহানি দেখতে চাই না। ইরানে সাধারণ মানুষ হত্যা করে মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ হোক। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনও দেশের ওপর মার্কিন দখলদারত্ব বন্ধ হোক। বন্ধ হোক অস্ত্র ব্যবসা আর যুদ্ধের খেলা। ছোট্ট এই গ্রহে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী হোক প্রার্থনা। ঘোর অমানিশা থেকে মুক্তি পাক আমাদের গ্রহ।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কবি।
১৪২ বার পড়া হয়েছে