রূপগঞ্জে বিএনপি নেতার নাম ব্যবহার করে চাঁদা ও লুটপাট, শ্রমিক আহত
মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৩:১৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় বিএনপি নেতার নাম ব্যবহার করে চাঁদা দাবি না মেনে একটি শিল্পকারখানায় হামলা, লুটপাট ও শ্রমিকদের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটেছে।
হামলার পর দুই দিন উৎপাদন বন্ধ থাকার পর বর্তমানে পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চলতে শুরু করেছে। ঘটনার পর মামলা হলেও অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী এক নেতার নাম এজাহার থেকে বাদ দিতে পুলিশ চাপ প্রয়োগ করেছে।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও এলাকায় অবস্থিত ‘বি.এল.ও ওয়্যার নেইল ইন্ডাস্ট্রিজ’ কারখানায়।
কারখানার মালিক মনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান ওরফে হুমায়ুনের নাম ব্যবহার করে স্থানীয় কিছু বিএনপি নেতা-কর্মী ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। বিষয়টি একাধিকবার মাহফুজুর রহমানকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযুক্তদের সঙ্গে ‘মীমাংসা’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তার।
মনোয়ার হোসেন আরও বলেন, চাঁদা না দেওয়ায় উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বেলায়েত আকনের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি কারখানায় হামলা চালায়। হামলায় কারখানার ম্যানেজারসহ কয়েকজন শ্রমিককে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করা হয়। এ সময় নগদ অর্থ ও মালামালসহ প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদ লুট করা হয়েছে।
ঘটনার পর বুধবার মনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় বেলায়েত আকনকে প্রধান আসামি করে ৯ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় নাম উল্লেখ থাকা অন্যান্যরা হলেন—
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই কাজল আকন
মাহফুজুর রহমানের ভাইয়ের ছেলে নিশাত আকন
মাহফুজুর রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপি কর্মী মো. সাদিকুল
মো. ফাহিমসহ আরও কয়েকজন।
বাদীর দাবি, তিনি এজাহারে ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে মাহফুজুর রহমানের নামও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে জানায়, তার নাম বাদ না দিলে মামলা গ্রহণ করা হবে না। ফলে বাধ্য হয়ে বাদীর নাম ছাড়া মামলা নথিভুক্ত করা হয়।
রোববার সকালে সরেজমিনে কারখানায় গিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের স্পষ্ট চিহ্ন দেখা গেছে। কারখানার ভেতরে-বাইরে ছড়িয়ে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ ও মালামাল ঘটনার ভয়াবহতার প্রমাণ দিচ্ছিল। শ্রমিকরা অপরিচিত কাউকে দেখলেই আতঙ্ক প্রকাশ করছেন।
কারখানার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ জানান, হামলার পর দুই দিন কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। এখন নারায়ণগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু আছে। আগে ৪০ জন শ্রমিক দিন-রাত কাজ করত, এখন মাত্র ১৫ জন শ্রমিক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, কারখানা এলাকার বাইরে শ্রমিকদের পেলে হামলাকারীরা হত্যা ও গুমের হুমকি দিচ্ছে।
স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজি নতুন নয়। তবে এ ঘটনায় সরাসরি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নাম জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে চেষ্টাও করা হয়েছে, তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মামলায় একজন প্রভাবশালী নেতার নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়—হামলার প্রকৃত নেপথ্যকারীরা চিহ্নিত হন কি না, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় কি না, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত সম্ভব হয় কি না।
পুলিশের পাহারায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হলেও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। শিল্পাঞ্চলে এমন ঘটনায় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
১৭২ বার পড়া হয়েছে