ভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার; ৭৩ বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি নুরুল হুদা চৌধুরী
শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৭:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্রহত্যার সংবাদ টেলিফোনে প্রথম কক্সবাজারে পৌঁছায় তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মৌলভী গফুরুজ্জামান চৌধুরীর কাছে।
সেখান থেকে খবরটি পান তৎকালীন সিএন্ডবি প্রকৌশলী এস আর খান। তিনি বিষয়টি জানান তার ভাগ্নে, কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র খালেদ মোশাররফ-কে।
খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খালেদ মোশাররফ তা তার সহপাঠীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন এবং নিজ উদ্যোগে কক্সবাজার হাইস্কুলে ছাত্রদের সংগঠিত করেন। ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে।
সেদিনের মিছিলে নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাসী ও নুরুল হুদা চৌধুরী। মিছিল শেষে শহরের বাহারছড়া এলাকায় ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তব্য দেন খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাসী, সালামত উল্লাহ, নুরুল হুদা এবং আমিরুল কবির চৌধুরী।
২২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার শহরের বটতলায় একটি অনির্ধারিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন শুধু ছাত্ররাই নয়, কক্সবাজারের সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
২৩ ফেব্রুয়ারি পুরো কক্সবাজার মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। আগের দিনের তুলনায় এদিন জনতার অংশগ্রহণ ছিল কয়েকগুণ বেশি। শহরের প্রধান সড়কগুলো মিছিলের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতার মিছিল নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে একটি প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়।
সমাবেশ শেষে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণের লক্ষ্যে বিকেলে কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন খালেদ মোশাররফ, আখতারুজ্জামান চৌধুরী, নুরুল হুদা চৌধুরী ও নাসির উদ্দিন।
সভা চলাকালীন এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল। তিনি প্রথমে নুরুল হুদা চৌধুরীকে আটক করেন। পরে বাদশা মিয়া চৌধুরী, প্রফেসর মোস্তাক ও এখলাস খালাসিকেও আটক করা হয়। এ ঘটনায় সভা পণ্ড হয়ে যায়।
তবে আটকের পরের দিন রাতেই নুরুল হুদা চৌধুরীসহ আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এই ঘটনাগুলো দালিলিক ইতিহাসে সংরক্ষিত থাকলেও দীর্ঘ ৭৩ বছর পরও অনেকেই ভাষাসৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। সরাসরি ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেফতার হওয়া সত্ত্বেও স্বীকৃতি বঞ্চিতদের মধ্যে অন্যতম নুরুল হুদা চৌধুরী, যিনি ২০২০ সালে ইন্তেকাল করেন।
তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর অন্তত মরনোত্তর ভাষাসৈনিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তার সহধর্মিনী আক্তার বেগম।
সাগরপাড়ের শহর কক্সবাজারে ভাষার অধিকার রক্ষায় এই আন্দোলন ছিল নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। বড় মঞ্চ বা প্রচারের আলো না থাকলেও ছিল মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।
ভাষা আন্দোলনের এই অধ্যায় স্মরণ করিয়ে দেয়—ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও অস্তিত্বের প্রতীক। ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, কিছু ইতিহাস মানুষের রক্ত, ঘাম ও অশ্রুতে লেখা হয়। সেই ইতিহাসকে স্মরণ করা মানে কেবল অতীতকে ফিরে দেখা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকা।
তাই আজও উচ্চারিত হয় সেই অমর পঙক্তি—“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।”
কক্সবাজারের ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাহসী ছাত্র-জনতার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।
১২০ বার পড়া হয়েছে