প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি
আশা করি বিশ্বাসের মূল্য দেবেন
বৃহস্পতিবার , ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৪:২০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্রীতি ও শুভেচ্ছা নিবেন।
আপনার অভূতপূর্ব বিজয়ে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে বাংলাদেশে। বহু দিনের গণতান্ত্রিক খরায় ভোগা বাংলাদেশ পুনরায় ফিরেছে গণতন্ত্রের ধারায়। আপনাকে অভিনন্দন।
বিজয়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আপনার অনুভূতি কেমন জানতে ইচ্ছে হয়। কেমন বোধ করছেন আপনি? কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেছেন মনে হচ্ছে, তাই না? মনে হচ্ছে না একটা স্বপ্নের জগতে বাস করছেন? চোখের পলকে চারপাশের সব কেমন বদলে যাচ্ছে আপনার! ঠিক স্বপ্নের ভেতর যেমনটা ঘটে, তেমন। এই মাটিতে, এই আকাশে! এই শুনশান নীরবতায়, এই অজস্র প্রাণোচ্ছ্বল কোলাহলে।
আর কখনো রাজনীতি করবেন না বলে একদিন মুচলেকা দিয়ে যে দেশ আপনাকে ছাড়তে বাধ্য করেছিল ওরা, ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ফিরেই সেই দেশের আপনি এখন প্রধানমন্ত্রী। আপনার চেয়ে পাওয়ারফুল, আপনার চেয়ে ক্ষমতাবান আর কেউ নেই এই দেশে এই মুহূর্তে।
অথচ এই দেশটাতেই আপনার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণের পর আক্রমণ করে গেছে ওরা! স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন যে মানুষটা, একটা সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন যিনি, তাঁর রাষ্ট্রীয় খেতাব কেড়ে নেওয়া হলো। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরোচিত অবদানকে রীতিমতো অস্বীকার করা হলো। এতেও ক্ষ্যান্ত হলো না তারা। সভ্যতা ভব্যতার সব সীমা পার করে তাঁকে পাকিস্তানের চর, রাজাকার বলতেও দ্বিধা করল না! মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর সেনাপতিকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি বলে গরম করে তুলল সংসদ!
আপনার বয়োঃবৃদ্ধ, অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়াকেও নোংরা কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করে গেছে ওরা দিনের পর দিন। সংসদে তাকে নিয়ে হাস্যরসে মেতে উঠেছে দালাল-অন্ধ-কানার দল। আপনার মাকে তাঁর স্বামীর শেষ স্মৃতি বিজোরিত বাড়ি থেকে উৎখাত করেছে নজিরবিহীন কায়দায়! আপনাকে নিয়েও উচ্চারণ অযোগ্য নানা কথা বলে বেরিয়েছে দিনরাত। সেই দেশেই আপনি আজ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আর তারা পাশের দেশে নির্বাসনে, ফেরারী ফাঁসির আসামী। মাথায় সীমাহীন লাঞ্ছনা ও জনঘৃণার বোঝা। প্রকৃতির কী অপূর্ব খেলা। কী অসাধারণ প্রতিশোধ!
আপনি কি কখনো ভাবতেন এমন একটি দিন আসবে আপনার জীবনে? আপনি আবার দেশে ফিরবেন, আপনার মা, বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা হবে দেশের বৃহত্তম জানাজাগুলোর অন্যতম, তিনি শেষ ঘুম ঘুমাবেন আপনার বাবার পাশে, এসব কি কখনো কল্পনায়ও দেখতেন আপনি? হয়তো কামনা করতেন মনে মনে, কিন্তু সেই কামনার সামনে পথ আগলে দাঁড়িয়ে যেতো, যুক্তি। বলতো, হবে না। এ সম্ভব না! ওই রক্তপিপাসু উন্মাদিনী থাকলে কিছুই হবে না।
কিন্তু তা হলো। আপনার সুদূর কল্পনাতেও যা ছিল না, সেইসব দিন আপনার এলো। আপনি দেশে ফিরে এলেন। মানুষের আকণ্ঠ ভালোবাসায় আপ্লুত হলেন। মায়ের জানাজায় অংশ নিলেন। মাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন বাবার পাশে। দেশের সমস্ত আলেম ওলামাসহ মিলিয়নের ওপর মানুষ যোগ দিলো তার শেষ বিদায়ের সভায়। তারপর অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে দেশের মানুষ আপনাকে দাঁড় করিয়ে দিলো সকলের মাথার ওপর। আপনি এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী!
এসব কীভাবে সম্ভব হয়েছে জানেন, সব হয়েছে বাংলাদেশে জুলাই এসেছে বলে। আবু সাইদ, ওয়াসিম, মীর মুগ্ধসহ প্রায় ২ হাজার তাজা প্রাণ ঝরে গেছে বলে। ৩০ হাজার মানুষ নিজেদের অঙ্গ হারিয়েছে বলে। ছোট্ট শিশু রিয়া গোপ, হেলিকপ্টার থেকে ছোঁড়া গুলিতে বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে যার, সে আপনাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। মাকে চিঠি লিখে বাড়ি ছাড়া সেই শহীদ আনাস আপনার জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। আরো শত শত শহীদ, শত শত আহত ভাইবোনেরা আপনার পথ উন্মুক্ত করেছে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের ওপরেই স্থাপিত হয়েছে আপনার বিজয় সিংহাসন।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী এ দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে আপনি কি চুপ করে থেকেছেন? না। তা থাকেননি। বরং দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে বসে থেকেও অনলাইন স্ক্রিণের সামনে বসে আপনি দেশকে নির্দেশনা দিয়েছেন। তরুণদেরকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছেন। আপনার দলের নেতাকর্মীরা সেভাবে রাস্তায় দাঁড়াতে না পারলেও তাদের অবদান কম নয়।
মির্জা ফখরুল যতই বলুন না কেন, এ আন্দোলনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা জানতাম, আছে। নামে বেনামে বিভিন্নভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনে ভূমিকা পালন করেছে আপনার দল। ছাত্রদলের ছেলেরা অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে রাজপথে। আপনিও লড়াই করেছেন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে। আমাদের সকলের সম্মিলিত লড়াইয়ের ফসল আমাদের রক্তাক্ত জুলাই।
আমি ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছি। লিখেছি নিয়মিত। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাইয়ের শেষ দিন পর্যন্ত সব যৌক্তিক আন্দোলনে আমরা ছাত্রদের পক্ষে সরব-সোচ্চার থেকেছি। কখনো লেখায়, কখনো কবিতায়, কখনো বা প্রকাশ্যে ময়দানে। হাসিনার ঘোর দুঃশাসনের কালেও তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লিখেছি ৭৪ এর দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে উপন্যাস। জুলাইয়ে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি ফ্যাসিবাদের দেয়াল ভাঙার লড়াইয়ে।
দেশকে মুক্ত করার লড়াই আমাদের শেষ হয়েছে। এবার নতুন করে শুরু হয়েছে দেশকে গড়ে তোলবার লড়াই। এই লড়াইয়ের গুরুভার এবার আপনার কাঁধে ন্যস্ত। দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজপথে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে মানুষ, সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন আপনার। আমরা আশা করি আপনার যোগ্য নেতৃত্বে, বিরোধীদলের কার্যকর সহযোগীতায় আমাদের দেশটা সত্যিই পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশ আর কখনোই ফিরে যাবে না ঘোর ফ্যাসিবাদের কালে। সে স্বপ্ন আপনি দেখিয়েছেন, যে বিশ্বাস আপনার ওপর অর্পন করেছে মানুষ, তার মূল্য আপনি দেবেন, সেই আশা করি।
আমরা লেখালেখির মানুষ। দেশের ঘোর সংকটময় কালে নিয়মিত লেখালেখি ছেড়ে রাজনীতি নিয়ে সরব ছিলাম এতদিন। জুলাইয়ের অগ্নিগর্ভ থেকে জন্মনেওয়া ছাত্রদের দলের প্রতি সমর্থন দিয়েছি। আপনার দলের বিভিন্ন কাজকর্মের সমালোচনা করেছি। কিন্তু জানবেন, আমাদের এই সমালোচনা কখনোই বৈরীতার ছিল না। আমরা চেয়েছি, যে ভুল করে দেশ ছাড়া হয়েছে হাসিনা ও তার দল, আপনার দলও যেন একই ভুল আর না করে। একই গর্তে যেন না পড়ে।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সে-ই প্রকৃত বন্ধু, যে যথার্থ সমালোচনা করতে জানে। সমালোচক হলো মানুষের সেই আয়না; যার সামনে দাঁড়ালে নিজের খুঁতগুলো নিখুঁতভাবে চোখে ধরা পড়ে। সকল কাজে প্রশ্নহীন সমর্থন দেওয়া তো নির্লজ্জ তেলবাজদের কাজ। ওরা এসব করে, দিনরাত পদলেহন করে নেতার সুনজরে থাকতে চায়। দু পয়সা কামাতে চায়। আমাদের ওসব দায় নেই। তাই, যা কিছু মনে হয় ত্রুটিপূর্ণ বা দৃষ্টিকটু, তা নিয়ে কথা বলি, সমালোচনা করি। সামনেও করে যাবো। আমরা আপনার কাছে অভয় চাইবো না, নির্ভয়েই আপনার সমালোচনাযোগ্য পদক্ষেপের সমালোচনা করে যাবো।
আপনার কাছে প্রত্যাশা, জুলাইয়ে যে নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছে আমার দেশের মানুষের ওপর, তার সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার আপনি করবেন। বিচারের আগে তারা যেন কিছুতেই রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হতে না পারে। আমরা কাউকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাই না। তবে ন্যায় বিচার চাই। শহীদদের রক্তের ঋণ আমাদের শোধ করতেই হবে। আপনিও তাদের রক্তের কাছে ঋণী।
জনগণের প্রত্যাশিত ‘সংষ্কার’ আপনার পদক্ষেপের শুরুতেই স্থান পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। আপনি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করবেন। এর ম্যান্ডেট জনগণ আপনাকে দিয়েছে। দেশের মানুষ পরিবর্তনের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। মানুষের চোখের সেই ভাষা আপনি যথাযথভাবে পড়তে সক্ষম হবেন আশা করি।
পতিত ফ্যাসিবাদের ভূতেরা আপনাকে মাঝে মাঝে ডিসট্র্যাক্ট করতে চাইবে। কিন্তু আমরা চাইবো, আপনি শক্ত থাকবেন। আমরা সমালোচনা করে আপনাকে শক্ত থাকতে সাহযোগিতা করব। নতুন বাংলাদেশ আপনার হাতেই পা রাখবে পরিবর্তনের পথে।
দেশের তারুণ্যকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে যাওয়া শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যার বিচার আপনি করবেন, এটা আমাদের দাবি। যে বা যারাই থাকুক, যত শক্তিশালীই হোক, তাদের পরিচয় জাতির সামনে প্রকাশ করবেন। একইসাথে দাবি বাউল-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ এবং অন্তবর্তী সরকারের আমলে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর অনেক আঘাত এসেছে। বাউল ফকিররা আক্রান্ত হয়েছে, পীর ফকিরের মাজার ভাঙা হয়েছে, এসবা আমরা আর দেখতে চাই না।
সব ধর্ম, মত ও পথের মানুষকে নিয়েই আমাদের প্রিয় এই দেশ। ধার্মিক, অধার্মিক, উত্তম-মধ্যম-অধম সবাই যেন যার যার স্বাধীনতা পায়। এখানে সবাই যেন নির্বিঘ্নে, স্বাধীনভাবে অন্যের ক্ষতি না করে তার জীবন ও জীবিকা চালিয়ে নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা আপনি করবেন। আর অবশ্যই, মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়, বাক স্বাধীনতা খর্ব হয়, লেখালেখির জন্য তুলে নিয়ে যায়, চাকরী চলে যায়, স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ বন্ধ হয়, এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। চাটুকারদের নিতে দেবেন না। আপনার চারপাশ ঘিরে থাকা কিছু মানুষ আপনার চেয়েও বেশি বিএনপি হয়ে উঠতে চাইবে, আপনি তাদেরকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করবেন, আশা করি।
নতুন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, আপনিই হন সেই বাংলাদেশের কারিগর। আপনার হাত ধরেই নতুন যুগের সূচনা হোক বাংলাদেশে। আপনার জন্য শুভকামনা।
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
(লেখক পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক। তার নিজের লেখা এই খোলা চিঠি)
১৩৬ বার পড়া হয়েছে