ভাষা আন্দোলনের শেকড় অনুসন্ধান ও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ
রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আলোচনার ক্ষেত্রে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সময়সীমা ধর্তব্যের মধ্যে নেয়া হলেও, এর শেকড় অনেক গভীরে।
ইতিহাসের নানা পরত অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে এই আন্দোলনটি শুধুমাত্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বিতর্কের ফলস্বরূপ নয়, বরং একটি দীর্ঘকালীন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ। যার সাথে জাতীয়তাবাদের উন্মেষের বিষয়টিও অনিবার্যভাবে চলে আসে।
১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র হলে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু প্রস্তাব করেন, যা পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিশাল বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে ড. জিয়াউদ্দীনের উর্দু প্রস্তাবটি কোন মৌলিক প্রস্তাব ছিল না। এই ধরনের বিতর্ক পূর্বে থেকেই চলছিল এবং এর ইতিহাস আরও প্রাচীন। মূলত ১৮৬৭ সালে বেনারসে অনুষ্ঠিত মুসলিম নেতৃবৃন্দের সম্মেলনে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে ভাষা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়, যেখানে মুসলিমদের প্রধান ভাষা হিসেবে উর্দুর পরিবর্তে হিন্দি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। সেই সময়ে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এবং অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ’৪৭-এ যখন ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয় তখন প্রায় সবার জানা হয়েছিল হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে হিন্দি হবে রাষ্ট্রভাষা। ডঃ জিয়া উদ্দীন স্বাভাবিকভাবে ধরে নিয়েছিলেন মুসলমান পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হতে হবে। কিন্তু আমরা বলতে পারি যে এমন প্রস্তাব উপস্থাপন করার সময় ডঃ জিয়া উদ্দীন শুধুমাত্র ঔপনিবেশিক ভারতের ভাষা ভিত্তিক হিন্দু-মুসলমান দ্বান্দ্বিক রাজনীতির পটভূমিকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। তিনি যদি নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সংযুক্তি, জনমিতি এবং ভাষা ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রকে বিবেচনায় নিতেন তাহলে তাঁর পক্ষে এমন উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হত না। কিন্তু বাস্তবতা হল পাকিস্তানি শাসকবর্গও তথাকথিত মুসলিম জাতীয়বাদের ভুল পাঠপ্রসূত নবগঠিত পাকিস্তানের জনমিতি এবং ভাষা ও সাংস্কৃতিক মানচিত্রকে উপেক্ষা করে উর্দুকে বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালির ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল। যা বাঙালি জাতির চৈতন্যে এক অভিঘাত সৃষ্টি করল এবং ঐক্যবদ্ধ করল সমগ্র জাতিকে। নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে মুসলিম জাতীয়তাবাদের স্থলে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হল।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র তের দিন পর পোস্টকার্ড, খাম ও ডাক বিভাগের অন্যান্য ফর্মে প্রচলিত ইংরেজির সাথে উর্দুও জুড়ে দেয়া হয়। পূর্ববাংলার অল্প শিক্ষিত মানুষও অল্প স্বল্প ইংরেজি পড়তে পারত। কিন্তু উর্দু ছিল তাদের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য। ’৪৭ এর ডিসেম্বরে সরকার ঘোষণা করে যে,যে নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়া হবে তাতে লেখা থাকবে শুধু ইংরেজি ও উর্দু, বাংলা নয়। যা ছিল শতকরা চুয়ান্ন শতাংশ বাংলা ভাষাভাষী অধ্যুষিত পাকিস্তানে অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারী সিন্ধান্ত। যা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক আব্দুল মতিন (তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারিরা বাংলা ভাষার পক্ষে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েকদিন পর প্রথম প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। রাজনীতিবিদদের মধ্যে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মাওলানা হামিদ খান ভাসানি বাংলা ভাষার মর্যাদার কথা বলেন। শেখ মুজিবুর রহমান তখন সবে মাত্র কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। তরুণ নেতা হিসেবে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ’৪৮ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে উর্দু ও ইংরেজির সাথে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবী তোলেন। তাঁর দাবীর বিরোধিতা করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। সংসদে কথা বলার সুযোগ নাই এই অভিযোগে মাওলানা ভাসানী গণপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। উল্লেখ্য এর পর তিনি আর কখনো সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেননি। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ঢাকায় এক অভূতপূর্ব হরতাল পালিত হয়। ঐদিন অন্তত ৬৫ জন ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। এখানে উল্লেখ্য, ১১ মার্চকে ১৯৫২ সালের পূর্ব পর্যন্ত ‘রাষ্ট্রভাষা দাবী দিবস’ হিসেবে পালন করা হত। ১৯ মার্চ ’৪৮ গভর্নর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকা আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্সে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন-
“আমি আপনাদের সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। অন্য কোন ভাষা নয়। যে কেউ অন্য পথে চালিত হবে সে হবে পাকিস্তানের শত্রু” ।
জনগণ জিন্নাহর এই বক্তব্য মেনে নেয়নি। সমাবেশস্থলেই “না” “না” রব ওঠে। যা ছিল বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে প্রদত্ত ভাষণে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উল্লেখ করলে ছাত্র সমাজ সাথে সাথে “নো” “নো” বলে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। জিন্নাহ তাঁর জীবদ্দশায় আর কখনো উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেননি। ফলে তখন থেকে ’৫২ পূর্ববর্তী সময় ভাষা আন্দোলন ছিল অনেকটা স্তিমিত। সুতরাং ’৪৮ পরবর্তী রাষ্ট্রভাষা বিতর্ককে যদি আমরা মোটা দাগে দেখি তাহলে চারটি মৌল বিষয় পরিলক্ষিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র তের চৌদ্দ দিনের মাথায় পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ের তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বাংলা ভাষার পক্ষে প্রতিবাদ মিছিল। দ্বিতীয়ত, গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মাওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য রাজনীতিবিদদের বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান। তৃতীয়ত, ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সর্বশ্রেণির জনগন কর্তৃক জিন্নাহর উর্দু রাষ্ট্রভাষা প্রস্তাব প্রত্যাখান। চতুর্থত, ২৪ মার্চ কার্জন হলে ছাত্র সমাজ কর্তৃক জিন্নাহর প্রস্তাবের তীব্র বিতোধিতা এবং সর্বশেষ ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকগণের বাংলার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন।
উল্লিখিত বিষয়ে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে সহজেই লক্ষনীয় যে, এই সময়ে সর্বশ্রেণির মানুষের মধ্যে এক নব চেতনার উন্মেষ ঘটছে। যে চেতনার মূলে রয়েছে বাংলা ভাষা ও তার মর্যাদার বিষয়টি। আর এই চেতনাই জন্ম দিয়েছে এক নব জাতীয়তাবাদের। যে জাতীয়তাবাদের বিস্ফোরণ হচ্ছে ’৫২ ফেব্রুয়ারিতে এবং যার উপর ভিত্তি করে আসে ’৫৪,’৬২,’৬৬,’৬৯,’৭০ এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস ।
১৭৫ বার পড়া হয়েছে