বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণে পটুয়াখালী-৪: ত্রিমুখী লড়াইয়ে উত্তেজনা
মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৯:৩৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া–রাঙ্গাবালী) আসনে তৈরি হয়েছে একেবারে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।
একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবং নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ না থাকায় ভোটের ঐতিহ্যগত ধারায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী মাঠ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভোটের হিসাব-নিকাশ নতুন সমীকরণে প্রবেশ করায় এ আসনকে ঘিরে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ, প্রত্যাশা ও কৌতূহল চোখে পড়ার মতো।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে পটুয়াখালী-৪ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের মধ্যে। পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী নির্বাচনী সমীকরণে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা।
কলাপাড়া উপজেলা ও নদীবেষ্টিত রাঙ্গাবালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনটি বরিশাল বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক এলাকা। এখানে রয়েছে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পায়রা সমুদ্রবন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন, পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা এবং মহিপুর মৎস্য বন্দর। ফলে রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও এই আসনের গুরুত্ব অপরিসীম।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ১৪ হাজার ৪৮১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮ হাজার ৮৩৬ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৫ হাজার ৬৪৫ জন। অন্যদিকে রাঙ্গাবালী উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে ভোটার রয়েছেন ৯৪ হাজার ৮৬৪ জন-এর মধ্যে পুরুষ ৪৭ হাজার ৬৬১ এবং নারী ৪৭ হাজার ২০৩ জন।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ হোসেন, যার প্রতীক ধানের শীষ। প্রতীক বরাদ্দের আগেই তিনি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে মাঠ গোছানোর কাজ শেষ করেন।
এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ধানের শীষে ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করলে পায়রা বন্দর ও পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটাকে ঘিরে বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। উপকূলীয় জনপদের মানুষ আর অবহেলিত থাকবে না। ১২টি ইউনিয়নের রাস্তাঘাটের দুর্ভোগ লাঘব করাই হবে আমার অগ্রাধিকার।’
বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলটির নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি ভাসমান ভোটের বড় একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রার্থী হয়েছেন অধ্যাপক মোস্তফিজুর রহমান, যার প্রতীক হাতপাখা। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়, ইসলামী আদর্শ, সুশাসন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন করছি। মানুষ পরিবর্তন চায়, আর আমি সেই পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ১০-দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের ডা. জহির উদ্দিন আহমেদকে সমর্থন দিয়েছেন। তার প্রতীক দেওয়াল ঘড়ি।
ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং একসময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী মাঠে তাকে সরাসরি তৎপর না দেখা গেলেও জোটের নেতাকর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ ও ভোটার ঐক্য গঠনে সক্রিয় রয়েছেন।
এদিকে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দলের উচ্চতর পরিষদের সদস্য মো. রবিউল হাসান, যার প্রতীক ট্রাক। তিনি স্বতন্ত্র ধারার রাজনীতি ও সংস্কারের বার্তা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি প্রভাব না ফেললেও ভোট বিভাজনে ভূমিকা রাখতে পারেন।
স্থানীয় ভোটারদের বড় একটি অংশের ধারণা, এবারের নির্বাচনে বিএনপির এবিএম মোশাররফ হোসেন চমক দেখাতে পারেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত এই ত্যাগী রাজনীতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কারণে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন। টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, ইউনিয়ন পরিষদের মাঠ-সবখানেই তার নাম আলোচনায়।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় এই নেতা উপজেলা বিএনপিতে যোগদানের পর এলাকায় দলকে সংগঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিএনপিকেও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, পটুয়াখালী-৪ আসনে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মরহুম আবদুর রাজ্জাক খান এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের আনোয়ার-উল-ইসলাম জয়ী হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপির মোস্তফিজুর রহমান নির্বাচিত হলেও একই বছরের ১২ জুনের নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগ আসনটি পুনরুদ্ধার করে। এরপর ২০০১ ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মাহবুবুর রহমান নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয়বার এমপি হন।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতা, মামলা ও অস্থিরতায় তারা ক্লান্ত। তারা এখন উন্নয়ন, শান্তি ও কর্মসংস্থানের রাজনীতি চান।
ভোটার নুরইসলাম বলেন, ‘আমরা এমন নেতা চাই, যিনি দলবাজি বা চাঁদাবাজি নয়, মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন।’
কৃষক আলাউদ্দিন খা বলেন, ‘টিভি টকশোর প্রিয় নেতা মোশাররফ হোসেন জিতলে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন হইবো। সিডর-আইলার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ আর রাস্তাঘাট ঠিক করতে সরকারী কাজ আনতে পারবো।’
জেলে কামাল বলেন, ‘পটুয়াখালী-৪ আসনে উন্নয়ন আনতে মোশাররফ পারবো। ওরে এমপি বানানো দরকার। টিভিতে ওর কথা হুনি, মানুষ হিসেবে ভালো মনে হয়।’
সব মিলিয়ে পটুয়াখালী-৪ আসনের নির্বাচন এবার হতে যাচ্ছে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ, বহুস্তরীয় ও প্রতিযোগিতামূলক- যেখানে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব।
১০৭ বার পড়া হয়েছে