নরসিংদীতে ৭শ' বছরের ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা শুরু, ভক্ত ও পুণ্যার্থীর ঢল
রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১:০২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নরসিংদী শহরের মেঘনা নদীর তীরে বর্ষান্তের আলোচনার মাঝে মুখরিত হয়ে উঠেছে ভক্ত ও পুণ্যার্থীর সমাগমে ঐতিহ্যবাহী বাউল মেলা।
শহরের কাউরিয়াপাড়ার শ্রী শ্রী বাউল ঠাকুরের আখড়ায় মাঘী পূর্ণিমার দিন শুরু হওয়া এই মেলাটি প্রায় সাতশ বছরের ইতিহাস বহন করছে। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; বরং মানবধর্ম, সাম্য ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য মিলনমেলা হিসেবে বিবেচিত।
গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া মেলায় দেশ-বিদেশ থেকে কয়েকশ বাউল সাধক অংশগ্রহণ করেছেন। আখড়ার প্রাঙ্গণ দিন-রাত বাদ্যযন্ত্রের মৃদু তালে, একতারা ও দোতারার সুরে এবং গানের গভীর দর্শনে মুখরিত। বাউলরা মানবতার জয়গান গাইছেন, মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগ্রত করার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের মতে, এই গান শুধু বিনোদন নয়, বরং শত শত বছর ধরে প্রবাহিত এক আধ্যাত্মিক সাধনার ধারাবাহিকতা।
বাউল সাধকরা জানিয়েছেন, এই আখড়ায় বাউল ঠাকুরের অন্তর্ধান হয়েছে। আখড়ায় জগন্নাথ দেবতার মন্দির রয়েছে, যেখানে মহাবিষ্ণুর পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা, জগন্নাথ দেবতার প্রতিমা, মা গঙ্গার গট, নাগ দেবতার বিগ্রহ এবং শিবলিঙ্গ প্রতিস্থাপিত রয়েছে। এটি বাউল ঠাকুর নিজে স্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। মন্দিরের পাশে আছে বাউল ঠাকুর ও মাতাজির সমাধি মন্দির।
আখড়ার কেন্দ্রে একটি বিশাল আটচালা বৈঠক ঘর রয়েছে। এখানে দেশ-বিদেশের বাউল সাধকরা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মিলিত হন। তবে এটি প্রচলিত বৈঠক নয়; এখানে কথার চেয়ে অনুভব বেশি গুরুত্ব পায়। বৈঠক ঘরে গান গাইছিলেন তিশা বাউল। তিনি বলেন, 'আমাদের গান সাধারণ বাউল সংগীত নয়। এগুলো মানুষের আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের গান। এই সাধনাই আমাদের পথ দেখায়। আমরা মানুষসহ সর্বজীবের মঙ্গল কামনা করি এবং বিশ্বের সকল মানুষের শান্তির জন্য প্রার্থনা করি। আমরা গানে গানে মানববন্ধনা করি।'
মেলায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শত শত নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেছেন। সবাই এক পরিচয়ে পরিচিত-মানুষ। আখড়ায় ঘি প্রদীপ, মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে মনোবাসনা পূরণের প্রার্থনা করছেন। নিয়মিত মেলায় আসা ভক্ত কাজল সাহা বলেন, 'এই মেলা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যজ্ঞের দিনে ঘি প্রদীপ দিয়ে পূজা করি। সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। এখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে আসে, এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।'
আকাশ চক্রবর্তী জানান, তিনি ছোটবেলা থেকে পরিবারের সঙ্গে মেলায় আসছেন। 'এখানে এসে ঘি প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাকুরের কাছে পরিবারের ও দেশের কল্যাণে প্রার্থনা করি। পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরে মেলায় ঘুরে আনন্দ উপভোগ করি।'
বাউল মেলার তত্ত্বাবধায়ক সাধন চন্দ্র বাউল বলেন, 'প্রতি বছর মাঘী পূর্ণিমার দিনে এই যজ্ঞের মাধ্যমে সকল জীবজগতের কল্যাণ কামনা করা হয়। আমরা মানুষকেই বড় করে দেখি। আমাদের সাধনা মানুষের মন থেকে মলিনতা দূর করা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবাই এখানে আসে-এটাই বাউল দর্শনের আসল শক্তি।'
ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের পাশাপাশি মেঘনা নদীর তীরে বসেছে রঙিন গ্রামীণ মেলা। নাগরদোলা, চড়কি শিশু-কিশোরদের আনন্দে ভরিয়ে তুলেছে। সারি সারি দোকানে বিক্রি হচ্ছে মাটির পুতুল, হাড়ি-কলসসহ নানা তৈজসপত্র। মিষ্টির দোকানে জিলেপি, বাতাসা এবং গ্রামীণ খাবারের সমারোহ মেলার আনন্দ আরও বাড়িয়েছে। সন্ধ্যা নামলে আলো আর মানুষের কোলাহলে নদীর পাড় যেন উৎসবের শহরে পরিণত হয়।
এই বাউল মেলা কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি নরসিংদীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। এখানে মানুষ আসে প্রার্থনা করতে, গান শুনতে এবং নিজেদের ভেতরের শান্তি খুঁজে পেতে।
১২৬ বার পড়া হয়েছে