পাহাড় থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে রামহিম লিয়ান বম, কিন্তু সংকটে তার নিজ জনগোষ্ঠী
সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ৯:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ বগালেক থেকে উঠে আসা টেবিল টেনিস তারকা রামহিম লিয়ান বম আজ বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নাম।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে তিনি দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনলেও, তার এই অর্জনের ছায়ায় চাপা পড়ে আছে নিজ বম জনগোষ্ঠীর গভীর মানবিক সংকট।
রুমা উপজেলার বিদ্যুৎ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত বগালেক পাড়ায় জন্ম রামহিমের। চার বছর বয়সেই বাবা জুয়াডম বম ছেলেকে আবাসিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান, উদ্দেশ্য- পাহাড়ের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়া। স্কুলজীবনে বড়দের টেবিল টেনিস খেলতে দেখেই খেলাটির প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয় তার। ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে রূপ নেয় স্বপ্নে।
২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকায় এসে জাতীয় টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি ইভেন্টেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে নজির গড়েন রামহিম। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তাকে দেশের অন্যতম সেরা টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের দলকে সেরা ১৬- এ পৌঁছাতে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে মাঠে রামহিমের এই উত্থানের সময়েই তার নিজ বম জনগোষ্ঠী এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)- এর ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর শুরু হওয়া নিরাপত্তা অভিযানে বহু নিরপরাধ বম নাগরিককে আটক করা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও বিচার ছাড়াই অর্ধশতাধিক বম নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দী রয়েছেন।
আটককৃতদের মধ্যে শিশু ও গর্ভবতী নারীও ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কারাগারে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার অভাবে অন্তত তিনজন বম নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
অভিযান ও গ্রেপ্তারের আতঙ্কে হাজার হাজার বম নাগরিক নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে পাহাড়ের গভীর জঙ্গল কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশের সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে অনেক বম পাড়া এখন জনশূন্য, নিস্তব্ধ ও আতঙ্কে ঢাকা।
রামহিম লিয়ান বমের সাফল্য প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা পেরিয়েও পাহাড়ের তরুণরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তবে তার এই অর্জনের প্রকৃত মর্যাদা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তার নিজ জনগোষ্ঠীর নিরপরাধ মানুষ ন্যায়বিচার পাবে এবং পাহাড়ে শান্তি ও আস্থার পরিবেশ ফিরে আসবে।
১১৯ বার পড়া হয়েছে