নোয়াখালীর ৩ উপজেলায় নেই কোনো হিজড়া ভোটার, বঞ্চিত তৃতীয় লিঙ্গ
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ৭:২৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকায় তৃতীয় লিঙ্গের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি চালু থাকলেও নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগ উপজেলায় এখনো একজন হিজড়ার নামও ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৫ সংসদীয় আসনের আওতাভুক্ত এই তিন উপজেলায় বসবাসকারী হিজড়া জনগোষ্ঠী কার্যত ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছে।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, নোয়াখালী জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৬৪৮ জন এবং নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৭৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে নিবন্ধিত ভোটার মাত্র ১৪ জন।
এই ১৪ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারের মধ্যে নোয়াখালী-১ আসনে ১ জন, নোয়াখালী-২ আসনে ১ জন, নোয়াখালী-৩ আসনে সর্বাধিক ৮ জন, নোয়াখালী-৪ আসনে ৩ জন এবং নোয়াখালী-৬ আসনে ২ জন রয়েছেন। তবে নোয়াখালী-৫ আসনে এখনো কোনো হিজড়া ভোটার তালিকাভুক্ত হয়নি। অথচ জেলার ৯টি উপজেলায় দুই হাজারেরও বেশি হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার নিবন্ধন ফরম (ফরম-২) সংশোধন করে হিজড়াদের জন্য স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি চালু করার পাশাপাশি স্বেচ্ছায় পুরুষ অথবা নারী হিসেবেও নিবন্ধনের সুযোগ রেখেছে। বাড়ি বাড়ি ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৫ আসনের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও সেনবাগ উপজেলায় এর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। ফলে এসব এলাকায় হিজড়া ভোটারের সংখ্যা শূন্যই রয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তিন উপজেলায় হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করলেও অনেকেই ভোটার তালিকায় তৃতীয় লিঙ্গের আলাদা ক্যাটাগরি সম্পর্কে অবগত নন। কেউ কেউ জানান, বিষয়টি নিয়ে তাদের কখনো অবহিত করা হয়নি কিংবা ভোটার হতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও তারা পাননি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত জটিলতা, বাবা-মায়ের কাগজপত্রের অভাব এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক অবহেলার কারণে তারা ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারছেন না। এর ফলে তারা শুধু ভোটাধিকার নয়, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার লাকী হিজড়া বলেন, 'সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় এখনো একজনও হিজড়া ভোটার তালিকাভুক্ত নেই। অথচ এসব এলাকায় দুই শতাধিক হিজড়া বসবাস করছেন। অনেকেই ছোটবেলা থেকেই আমাদের সঙ্গে থাকলেও তাদের বাবা-মায়ের কোনো কাগজপত্র নেই। ভোটার হতে যে কাগজ লাগে, সেগুলো আমাদের অনেকের কাছেই নেই। তাই চাইলেও মূলধারায় আসতে পারছি না।'
হিজড়া সম্প্রদায়ের গুরু মা আলো হিজড়া বলেন, 'আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করা মানে আমাদের আরও পিছিয়ে দেওয়া। সহজ ও মানবিক প্রক্রিয়ায় ভোটার নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।'
এ বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, 'আমি প্রায় এক বছর ধরে এই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছি। এ সময়ে কোনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ ভোটার হতে আসেননি। ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম চলাকালে মাঠ পর্যায়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে কেউ ভোটার হতে এলে নির্বাচন অফিস সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।'
নোয়াখালীর সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাদেকুল ইসলাম জানান, তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে ভোটার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করতে বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি হিজড়া পল্লীতে সচেতনতামূলক উঠান বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'দীর্ঘদিন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখে থাকলেও রাষ্ট্র হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।'
তিনি আরও জানান, ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে হিজড়া সম্প্রদায়ের কেউ যেন হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার না হন, সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রে তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
১১৪ বার পড়া হয়েছে