মাদারীপুর-১ আসনে স্বতন্ত্র বনাম স্বতন্ত্রের লড়াই, বিএনপি প্রার্থী পিছিয়ে
শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ৫:৪০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যেই।
নির্বাচনী মাঠে বিএনপির প্রার্থী থাকলেও বাস্তব চিত্রে লড়াই অনেকটাই স্বতন্ত্র প্রার্থী বনাম স্বতন্ত্র প্রার্থীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে করে পিছিয়ে পড়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নাদিরা আক্তার-এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।
এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপিরই দুই প্রভাবশালী নেতা কামাল জামান মোল্লা ও সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী। ফলে বিএনপির ভোটব্যাংক তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত জেলা হওয়ায়, যে প্রার্থী আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোট বেশি নিজের পক্ষে টানতে পারবেন, তারই জয় নিশ্চিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কামাল জামান মোল্লা: পারিবারিক রাজনীতিই বড় শক্তি
কামাল জামান মোল্লা শুরুতে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও পরবর্তীতে তা স্থগিত করা হয়। মনোনয়ন বাতিলের পর তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগের মাধ্যমে। একসময় তিনি শিবচর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন।
১৯৯১ সালের একটি হত্যা মামলার ঘটনায় তিনি জাপান চলে যান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশে ফিরে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন এবং দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং পরবর্তীতে প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও দাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
নির্বাচনী রাজনীতিতে তার বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বড় ভাই আ. লতিফ মোল্লার প্রভাব। আ. লতিফ মোল্লা শিবচরে ৯ বছর পৌর মেয়র ও ৫ বছর উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন এবং বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। স্থানীয়দের মতে, এ কারণে আওয়ামী লীগের বড় একটি ভোট কামাল জামান মোল্লার দিকেই যেতে পারে।
কামাল জামান মোল্লা বলেন, “আমি দলের ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতা। প্রথমে মনোনয়ন দিয়ে দল আমাকে সেই স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিছু কুচক্রি মহলের কারণে তা বাতিল হয়েছে। আমি স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হয়ে এই আসন বিএনপিকেই উপহার দেব।”
বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তার: বিভক্তিতে বিপাকে
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী নাদিরা আক্তার শিবচরের একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের প্রতিনিধি। তার স্বামী মরহুম নাজমুল হুদা মিঠু চৌধুরী ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি। শ্বশুর শামছুল হুদা চৌধুরী ও পরে তার ভাই আলতাব হোসেন চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর নাদিরা আক্তার রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং এবার বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তবে দলের দুই প্রভাবশালী নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তার বিজয় নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দলীয় ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলে তার জয় কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী।
নাদিরা আক্তার বলেন, “দলের ক্রান্তিকালে আমরা সবাই একসঙ্গে আন্দোলন করেছি। কথা ছিল, যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে সবাই তার পক্ষে কাজ করবো। আমি সবাইকে আহ্বান জানাই বিভক্ত না হয়ে ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।”
সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী: শেষ নির্বাচনের অঙ্গীকার
আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা ও সাংবাদিক মোতাহার হোসেন সিদ্দিকীর ছেলে। তিনি ও তার বোন নাবিলা চৌধুরী দুজনই বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। নাবিলা চৌধুরী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় এই নেতা নির্বাচনে শক্ত অবস্থানে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, “আমার জীবনের সবকিছু বিএনপির জন্যই করেছি। বয়স এখন ৭০ বছর, ভবিষ্যতে আর নির্বাচন করার সুযোগ নেই। দল মনোনয়ন না দেওয়ায় আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। শিবচরের মানুষ আমাকে ভালোবাসে—আমি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবো।”
সব মিলিয়ে, মাদারীপুর-১ আসনে এবারকার নির্বাচন দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব ও স্বতন্ত্র শক্তির লড়াইয়েই রূপ নিচ্ছে।
১১৫ বার পড়া হয়েছে