সৌদির নিরাপত্তা পুনর্বিন্যাস
মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে পাকিস্তান-তুরস্ক জোটে ঝুঁকছে রিয়াদ
বৃহস্পতিবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ২:৪৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি করেছে, ঠিক সেই সময় সৌদি আরব ধীরে ধীরে একক মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয় থেকে নিজেকে সরিয়ে বহুমুখী নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে—এবং পাকিস্তান–তুরস্ককে নিয়ে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অক্ষ সে কৌশলগত পুনর্বিন্যাসকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সমঝোতা ও কূটনৈতিক তৎপরতা পর্যবেক্ষকদের কাছে প্রশ্ন তুলেছে: রিয়াদ কি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত ছাতা থেকে বেরিয়ে একটি স্বতন্ত্র “ইসলামিক নেটো” গঠনের পথে হাঁটছে?
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক কয়েক দশক ধরেই তেল, নিরাপত্তা ও অস্ত্রচুক্তিকে ঘিরে গড়ে উঠলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সম্পর্কের ভৌত রূপ বদলাতে শুরু করেছে। ২০১৯ সালের আবকাইক তেল স্থাপনায় ড্রোন ও মিসাইল হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত প্রতিক্রিয়া এবং ইয়েমেন যুদ্ধ, মানবাধিকার ইস্যু ও কংগ্রেসের চাপ রিয়াদকে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করিয়েছে যে কেবল মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর ভর করে থাকা ঝুঁকিমুক্ত নয়। সাম্প্রতিক ইরান–সংকটে সৌদি নেতৃত্ব ইরানে সম্ভাব্য হামলার ক্ষেত্রে নিজেদের ভূমি ও আকাশসীমা ব্যবহার না করার যে বার্তা দিয়েছে, তা রিয়াদের নতুন কৌশলগত আত্মবিশ্বাস এবং “স্বাধীন নিরাপত্তা পলিসি”র ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্টকে বিশ্লেষকরা একটি গেম–চেঞ্জার হিসেবে বর্ণনা করছেন। চুক্তি অনুযায়ী, দু’দেশের যেকোনো একটির ওপর “বহিঃআক্রমণ” অন্যটির বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে—যা কার্যত নেটোর অনুচ্ছেদ ৫–এর অনুরূপ সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারা। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সৌদি আরব প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিটারেন্সকে নিজের নিরাপত্তা স্থাপত্যের অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন সামরিক পর্যবেক্ষকরা। বিনিময়ে পাকিস্তান সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সহায়তা ও বিনিয়োগ নিশ্চয়তা পাবে, যা তার নড়বড়ে অর্থনীতির জন্য এক ধরনের নিরাপত্তা গ্যারান্টি হিসেবেও কাজ করবে।
এই অক্ষকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই তুরস্কের সক্রিয় তৎপরতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আঙ্কারা এই সৌদি–পাকিস্তান জোটে যোগ দিতে চাইছে, যেখানে তুরস্ক তার নেটো–অভিজ্ঞতা, উন্নত ড্রোন ও প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা বলয় গড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তুর্কি ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে এ উদ্যোগকে অনেকেই “ইসলামিক নেটো”–ধরনের কাঠামোর প্রাথমিক রূপ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, যদিও সংশ্লিষ্ট সরকারগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করে এ জোটকে বিদ্যমান জোটব্যবস্থার “বিকল্প নয়, পরিপূরক” হিসেবে তুলে ধরছে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি অর্থ ও ধর্মীয় কেন্দ্রিকতা, পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও জনবল, আর তুরস্কের সামরিক–প্রযুক্তিগত দক্ষতা মিলিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য সুন্নি নিরাপত্তা অক্ষ গড়ে উঠতে পারে, যা ইরানকে প্রতিরোধের পাশাপাশি পশ্চিমা জোটের সঙ্গে দর–কষাকষিতেও নতুন ওজন যোগ করবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করেই সৌদি আরব ও তার মিত্ররা এক ধরনের “হেজিং স্ট্র্যাটেজি” গ্রহণ করেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অস্ত্র ক্রয় ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে বেইজিং, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার দিকে ঝুঁকে বিকল্প নিরাপত্তা ছাতা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে যে কোনো বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রিয়াদ সম্পূর্ণভাবে মার্কিন সিদ্ধান্তের করুণার ওপর নির্ভরশীল না থাকে। ইরান–সংকটে সৌদি আরবের সতর্ক ভূমিকা, গালফ দেশগুলোর সম্মিলিতভাবে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে নীরব আপত্তি এবং পাকিস্তান–তুরস্কের সাথে বাড়তি সামরিক সমন্বয়—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা মানচিত্রে এক নতুন শক্তি–বলয়ের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, মার্কিন প্রভাববলয়ের ভেতর থেকেও সৌদি আরব এখন “স্ট্যাটাস ক্বো অ্যালাই” থেকে “অটোনোমাস পাওয়ার ব্রোকার” হওয়ার পথে হাঁটছে; এবং পাকিস্তান–তুরস্ক–কেন্দ্রিক এই নতুন প্রতিরক্ষা জোট সেই পথচলাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১৩০ বার পড়া হয়েছে