আড়িয়াল খাঁসহ একাধিক নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, ভাঙনে জনপদ
মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মাদারীপুরে আড়িয়াল খাঁ নদসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন যেন প্রকাশ্য মহোৎসবে রূপ নিয়েছে।
জেলা শহরের গোড়াইন এলাকা থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ সিএফটি বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব কর্মকাণ্ড চললেও রহস্যজনক কারণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, কোটি কোটি টাকার এই অবৈধ বালু ব্যবসার কাছে তারা সম্পূর্ণ অসহায়। নদীভাঙনে ফসলি জমি, গ্রামীণ রাস্তা এমনকি বসতভিটাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে হামলা, হুমকি ও মিথ্যা মামলার শিকার হতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে জেলা প্রশাসন লোক দেখানো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে কয়েকজন শ্রমিককে জরিমানা বা কারাদণ্ড দিলেও মূল বালু ব্যবসায়ীরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী লিখিত অভিযোগ ও মানববন্ধন করলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়িয়াল খাঁ নদ, কুমার নদসহ আশপাশের ছোট ছোট খালগুলোতে সারি সারি করে বসানো হয়েছে ড্রেজার ও বল্কগেট। কিছু ড্রেজার সরাসরি নদী থেকে বালু তুলে বল্কগেটে ভর্তি করছে। একটি বল্কগেট বালু ভর্তি হয়ে চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি খালি বল্কগেট সেখানে এসে ভেড়ে। এভাবেই প্রতিদিন অবৈধভাবে লক্ষ লক্ষ সিএফটি বালু উত্তোলন করছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল।
দিনের বেলায় হাতে গোনা কয়েকটি ড্রেজার দিয়ে মাঝ নদ থেকে বালু তোলা হলেও রাত গভীর হলেই ১০ থেকে ১২টি ড্রেজার একযোগে কাজ শুরু করে। রাতে অনেক ড্রেজার নদীর পাড় ঘেঁষে বালু উত্তোলন করায় ভাঙনের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এই অবৈধ বালু উত্তোলনের তাণ্ডবে মহিষের চর, পাঁচখোলা, ব্রাহ্মণদী, চরনাছনা, লক্ষ্মিপুর ও বাহেরচর কাতলা গ্রামগুলোতে তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, ভেঙে পড়ছে গ্রামীণ সড়ক। চোখের সামনে নিজেদের জমি নদীতে হারাতে দেখে এলাকাবাসী একাধিকবার জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানালেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরে বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করলেও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা মোতাহার কাজী, সোহরাব মাতুব্বর, রফিক হাওলাদার ও রুনিয়া বেগম জানান, বছরের পর বছর ধরে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে এভাবেই বালু কেটে নেওয়া হচ্ছে। দিনে মাঝ নদ থেকে এবং গভীর রাতে নদীর পাড়ে ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হয়। এতে নদীর পাড় ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত গভীর হয়ে গেছে, যার ফলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। তাদের ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে, এমনকি রাস্তাও ভেঙে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক-দুই বছরের মধ্যে বসতবাড়িও নদীভাঙনের কবলে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
তারা আরও জানান, কেউ প্রতিবাদ করলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হয়। রাতে বাড়ি বাড়ি লোক পাঠিয়ে দেখা হয় মানুষ ঘুমিয়েছে কি না। অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে তখনই নদীর একেবারে পাড়ে ড্রেজার বসিয়ে সারারাত বালু তোলা হয়। চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছে বিচার দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় দেলোয়ার মুন্সী জানান, বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় তাকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। তিনি মামলা করলে বালু ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করে। ভয়ের কারণে এলাকার কেউ তার পাশে দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমানে তিনি একাই নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া মামলাগুলো লড়ছেন। তিনি বলেন, “যখন কেউ পাশে দাঁড়ায়নি, তখন আমিও এখন আর বালু চুরির বিষয়ে কথা বলি না। সবার যা হবে, আমারও তাই হবে।”
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য তাহের মেম্বার ও বর্তমান ইউপি সদস্য রুবেল মেম্বার জানান, নদীর পাড়ে যাতায়াত ও খেয়াঘাটে চলাচলের সুবিধার জন্য খেয়াঘাট থেকে গ্রামের ভেতরে একটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই রাস্তাও এখন নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারা বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে আশপাশের চার-পাঁচটি গ্রাম ধীরে ধীরে নদীগর্ভে চলে যাবে।
তারা আরও জানান, একাধিকবার জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। এনামুল হাওলাদার, মিঠু হাওলাদার ও হাকিম বেপারীর নাম উল্লেখ করে তারা বলেন, এরা নদী থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। এছাড়াও আরও ৮-১০ জন এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। বালু ব্যবসা নগদ টাকার হওয়ায় সহজেই প্রশাসনকে ম্যানেজ করা সম্ভব হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন একটি বড় সমস্যা। উপজেলা প্রশাসনের একার পক্ষে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বিত উদ্যোগে অভিযান চালাতে হবে। মূল হোতাদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা গেলে স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে মূল হোতাদের সনাক্ত বা তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
১১৬ বার পড়া হয়েছে