অভিযানের মাঝেই খুন: নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা উদ্বেগ তীব্র
বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ৩:৩০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশেষ অভিযান চললেও সারাদেশে খুনোখুনি থামছে না। নতুন বছরের প্রথম ছয় দিনেই আটটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গত সোমবার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের তিন জেলায় তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে মাথায় গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। রাত আটটার দিকে চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদারকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর তিন ঘণ্টা পর নরসিংদীর পলাশে গুলি করে হত্যা করা হয় মনি চক্রবর্তী নামে এক মুদি ব্যবসায়ীকে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় দিনে সংঘটিত আটটি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে পাঁচটিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুজনের মাথা লক্ষ্য করে, একজনের ঘাড়ে গুলি করা হয়। অন্যদের কেউ কুপিয়ে, কেউ শ্বাসরোধে হত্যার শিকার হন।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে “হতাশাজনক” বলে মন্তব্য করেছেন। মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, অনেক এলাকায় এখনও চিহ্নিত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার না করে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’-এ ২৩ দিনে ১৫ হাজার ৯ জনকে গ্রেপ্তার এবং ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অভিযানের মধ্যেও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, দেশে বছরে গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার খুন হয়। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তার কাজ করছে। পরিকল্পিত এসব হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করা কঠিন হলেও জড়িতদের গ্রেপ্তার করলে সহিংসতা কমে আসে বলে তিনি দাবি করেন।
পুলিশ ও কারাগার থেকে লুণ্ঠিত বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনও উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখনো এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজারের বেশি গোলাবারুদ বেহাত রয়েছে। এসবের মধ্যে চায়না রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি ও পিস্তল রয়েছে।
লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সরকার পুরস্কার ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই হাজার ২৩২ বন্দির মধ্যে এখনও ৭১০ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদের মধ্যে হত্যা মামলার আসামি ও যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীরাও রয়েছে। কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদও এখনো উদ্ধার হয়নি।
কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, পলাতক বন্দি ও লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশের হিসাবে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে তিন হাজার ৫০৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও বেহাত অস্ত্রের বিস্তার।
২০৩ বার পড়া হয়েছে