বাসচালক থেকে রাষ্ট্রপ্রধান: নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক পথচলা
শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ৪:৪৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
লাতিন আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের আগ পর্যন্ত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশটি শাসন করেছেন। তাঁর শাসনকাল জুড়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক পাশাপাশি চলেছে।
নিকোলাস মাদুরো: ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
নিকোলাস মাদুরো মোরোস ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন; তরুণ বয়সে তিনি পেশাগতভাবে বাসচালক হিসেবে কাজ করতে করতে গণপরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে উঠে আসেন, যা পরবর্তীতে তাঁর বামপন্থি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দেয়। তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস একজন আইনজীবী ও প্রভাবশালী রাজনীতিক, যিনি ভেনিজুয়েলার অ্যাটর্নি জেনারেল ও জাতীয় পরিষদের স্পিকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন; দম্পতির ছেলে নিকোলাস মাদুরো গেরার্ডোও যুবনেতা হিসেবে দলীয় ও সরকারি কর্মকাণ্ডে সক্রিয়, যদিও পরিবারের আর্থিক প্রভাব ও ক্ষমতায় অংশীদারিত্ব নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে নানামুখী আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে।
জীবন ও রাজনৈতিক উত্থান
নিকোলাস মাদুরো ১৯৬২ সালে কারাকাসে জন্ম নেন এবং তরুণ বয়সে বাসচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি গণপরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেন। পরে বামপন্থি বলিভারীয় আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি হুগো চাভেসের ঘনিষ্ঠ সহযোগীতে পরিণত হন।
২০০০ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংসদীয় ক্যারিয়ার শুরু হয়; পরবর্তীতে তিনি জাতীয় পরিষদের সভাপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত চাভেসের উপ–রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রেসিডেন্ট পদে আরোহন ও নির্বাচন
২০১৩ সালে হুগো চাভেসের মৃত্যুর পর সংবিধান অনুযায়ী মাদুরো ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন এবং একই বছরের এপ্রিলের নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী এনরিক ক্যাপ্রিলেসকে হারিয়ে পূর্ণ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হওয়ার দাবি করেন; তবে এসব ভোটে বিরোধীদের অংশগ্রহণ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটের স্বাধীনতা নিয়ে দেশি–বিদেশি মহলে বিস্তর প্রশ্ন ওঠে।
শাসনের ধরন ও নীতি
মাদুরো নিজেকে হুগো চাভেসের সমাজতান্ত্রিক নীতির ধারক দাবি করলেও তাঁর শাসন অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে ক্রমশ বেশি কেন্দ্রীভূত ও নিরাপত্তা–নির্ভর বলে বিবেচিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও বিশেষ কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির মাধ্যমে বিরোধী–নিয়ন্ত্রিত সংসদের ক্ষমতা খর্ব করার পদক্ষেপ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তর্কের জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নানা প্রতিবেদনে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিরোধী, কর্মী ও প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন–পীড়ন, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠে এসেছে, যা সরকার অস্বীকার বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে।
অর্থনীতি, জনপ্রিয়তা ও অভ্যন্তরীণ চিত্র
তেলের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল অর্থনীতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ নীতি–ত্রুটি, দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ভেনিজুয়েলা মারাত্মক মুদ্রাস্ফীতি ও পণ্যের ঘাটতির মুখে পড়ে। অনেক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কয়েক বছরের ব্যবধানে দেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সঙ্কুচিত হয় এবং বিপুল সংখ্যক নাগরিক বিদেশে পাড়ি জমায়।
প্রথম দিকে নিম্নবিত্তের মধ্যে তাঁর একটি রাজনৈতিক সমর্থনভিত্তি থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট ও অভিবাসনের চাপের কারণে জনপ্রিয়তার ধারা নিয়ে ভেনিজুয়েলার ভেতরে–বাইরে মতবিরোধ দেখা যায়; সরকার নিজেকে শ্রমিক–কৃষক শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে, অন্যদিকে সমালোচকেরা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর শক্তি ব্যবহারকে তাঁর ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি বলে উল্লেখ করেন।
সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ
মাদুরোর ব্যক্তিগত সম্পদ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ সরকারি ঘোষণাপত্র সীমিত; বিভিন্ন উন্মুক্ত সূত্রে তাঁর সম্পদ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন অনুমান থাকলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশ তাঁর এবং সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক–সম্পর্কিত অপরাধ, দুর্নীতি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ এনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে; তবে ভেনিজুয়েলা সরকার এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।
আন্তর্জাতিক অবস্থান
মাদুরো সরকার রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে; এসব সম্পর্ক ভেনিজুয়েলার জন্য বিনিয়োগ ও কৌশলগত সমর্থন এনে দিলেও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক সংগঠন তাঁর নির্বাচনী বৈধতা ও মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে; তবে একই সময়ে লাতিন আমেরিকার কিছু রাজনৈতিক ধারায় তাঁকে এখনো মার্কিন প্রভাব–বিরোধী প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরা হয়।
ভেনিজুয়েলার রাজনীতিতে নিকোলাস মাদুরো এমন এক চরিত্র, যাকে একই সঙ্গে শ্রমিক–শ্রেণি থেকে উঠে আসা বামপন্থি নেতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থেকে ক্রমশ কঠোর হাতে শাসন করা প্রেসিডেন্ট—দু’দিক থেকেই দেখা হয়। তাঁর আমলে সামাজিক কর্মসূচি ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত নীতির পাশাপাশি গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট, অভিবাসনের ঢল, নির্বাচন–বিতর্ক ও মানবাধিকার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে দেশটি যেমন অভ্যন্তরীণভাবে ভেঙে পড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ব্যাপক সমালোচনা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, লেখক
১৩৬ বার পড়া হয়েছে