বাংলার বুকে জন্ম নেয়া এক রত্ন হারাল বাংলাদেশ
বৃহস্পতিবার , ১ জানুয়ারি, ২০২৬ ৭:০৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের বাইরে নিরাপদ জীবনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বারবার বাংলাদেশের মাটিতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কারণ তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল জনগণের পাশে থাকার অঙ্গীকার।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি কারাবরণ, গৃহবন্দিত্ব, গুরুতর অসুস্থতা, সন্তানহারা হওয়ার বেদনা ও রাষ্ট্রীয় চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। তবুও কখনো নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি। দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের এক নীরব কিন্তু দৃঢ় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন জীবন ও বন্দিত্ব
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। চট্টগ্রামে আত্মগোপনের পর ১৬ মে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। ২ জুলাই ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে সন্তানসহ আটক হয়ে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সামরিক হেফাজতে বন্দি ছিলেন।
তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় তাঁর পরিবারকেও এই পরিণতি ভোগ করতে হয়।
রাজনীতিতে প্রবেশ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হলে দলীয় নেতাদের আহ্বানে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। একই বছরের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে তিনি প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেন।
১৯৮৩ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে সাত দলীয় জোট গঠিত হয় এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
গণআন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা
এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন, হরতাল ও গণ-আন্দোলনে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দেন। একাধিকবার গৃহবন্দি ও গ্রেপ্তার হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি।
১৯৯০ সালে ছাত্রনেতা জেহাদের মৃত্যুর পর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার পতনের পথ সুগম হয়। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০-এ এরশাদ পদত্যাগ করলে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিনি পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিবারই বিপুল ভোটে জয়ী হন-যা বাংলাদেশে বিরল রাজনৈতিক রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
কারাবাস, অসুস্থতা ও শেষ সময়
২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা, একাধিক মামলায় কারাবাস এবং পারিবারিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়েও তিনি দলীয় নেতৃত্ব বজায় রাখেন। ২০১৮ সালে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেলেও দীর্ঘ সময় কার্যত গৃহবন্দি ছিলেন।
দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি মুক্ত হলেও গুরুতর অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি নারী নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, রাজপথের সংগ্রাম, আপসহীন নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হয়ে থাকবেন। এমন নারীর জন্ম যুগের পর যুগ অপেক্ষায় থাকার পরেও হয় না। বাংলার বুকে জন্ম নেয়া এক রত্ন হারাল বাংলাদেশ।
১১৫ বার পড়া হয়েছে