মানুষের জন্যই কি এই রাষ্ট্র ?
বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:৪০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে আজ যে স্থবিরতা এবং অহেতুক কালক্ষেপণ আমরা দেখছি, তা আসলে সাধারণ মানুষের প্রতি চরম অবহেলারই নামান্তর। অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময় নষ্ট করার অর্থ হলো—একজন মুমূর্ষু রোগীর আইসিইউ পাওয়ার সময় কেড়ে নেওয়া, একজন কৃষকের সেচের পানি অনিশ্চিত করা এবং একজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করা।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, রাষ্ট্রের প্রতিটি ইট আর সংসদের প্রতিটি আসবাবে মিশে আছে সাধারণ মানুষের হাড়ভাঙা খাটুনির ট্যাক্সের টাকা।
মানুষের জন্য রাষ্ট্র। তাই প্রতিষ্ঠানের আভিজাত্য নয়, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং পেটের ভাতের সংস্থানই হওয়া উচিত সরকারের লক্ষ্য।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় সংসদ হলো নীতি নির্ধারণ ও জনগণের অভাব-অভিযোগের সর্বোচ্চ মঞ্চ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ সচিবালয় পরিচালনায় বার্ষিক বরাদ্দ প্রায় ২৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে জনগণের ট্যাক্সের প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে —যেখানে সামান্য হামের টিকা না পেয়ে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে এবং শিক্ষিত যুবসমাজ চাকরির জন্য দিশেহারা হয়ে ধুঁকছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ১০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৬টি জেলায় প্রায় ৬,৪০০-এর বেশি শিশু সংক্রমিত হয়েছে ।
২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে টিকাদানের হার আশঞ্জাজনকভাবে কমে ৬০%-এর নিচে নেমে এসেছে ।
শিশুদের জীবন রক্ষাকারী সাধারণ একটি টিকা সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহতম হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
আজ যখন আধুনিক বিশ্বে হামের মতো রোগ ইতিহাস হওয়ার কথা, তখন বাংলাদেশের ৫৬টি জেলায় এই রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম প্রস্তুতির অভাবকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
যদি সঠিক সময়ে টিকা আমদানিতে বা জেলা পর্যায়ের আইসিইউ সচল হতো, তবে আজ শত মায়ের বুক খালি হতো না।
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো যুবসমাজ, অথচ আজ তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। শিক্ষিত হাজারো যুবক চাকরির পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরছে, কিন্তু বাজারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোতে দীর্ঘসূত্রতা এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা যুবকদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একজন গ্র্যাজুয়েট যুবক সামান্য আয়ের জন্য পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। এই বিশাল শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানোর কোনো কার্যকর রোডম্যাপ ছাড়াই সংস্কারের কথা বলা এক প্রকার তামাশা মাত্র।
সংসদীয় অধিবেশনে জনগণের মৌলিক সমস্যা—যেমন চিকিৎসা সংকট, বেকারত্ব বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি—নিয়ে গঠনমূলক আলোচনার চেয়ে একে অপরকে রাজনৈতিক 'স্ল্যাপ' বা ব্যক্তিগত আক্রমণের সংস্কৃতি আজ প্রকট।
সংসদ সদস্যরা যখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে একে অপরের ওপর দোষারোপ বা 'ব্লেম গেম'-এ মত্ত থাকেন, তখন বাইরে সাধারণ মানুষ চালের দামের জন্য হাহাকার করে। দলীয়করণ ও দুর্নীতির যে বিষবৃক্ষ প্রশাসন থেকে শুরু করে চাকরির বাজার পর্যন্ত ছড়িয়েছে, তা উপড়ে ফেলার চেয়ে একে অপরকে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়িতেই সময় ব্যয় হচ্ছে বেশি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা বা বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। বোরো মৌসুমের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সেচ কাজের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে দেশ বড় ধরনের খাদ্য সংকটে পড়বে। কিন্তু সংসদে এই জীবন-মরণ সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনার চেয়ে সংস্কারের নামে অতীতকে দোষারোপ করাতেই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
সরকারকে যেকোনো সংকট—স্বাস্থ্য, কৃষি বা বেকারত্ব যাই হোক—মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। অপচয় কমিয়ে সরাসরি তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা, যুবকদের কর্মসংস্থান এবং কৃষি ভর্তুকিতে স্থানান্তর করা জরুরি।
দুর্নীতি ও দলীয়করণের যে আগ্নেয়গিরি প্রশাসনকে গ্রাস করছে, তা বন্ধ না করলে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না।
অতীত নিয়ে একে অপরকে 'স্ল্যাপ' করা বন্ধ করে বর্তমানের শিশুদের টিকা, যুবকদের সম্মানজনক চাকরি এবং কৃষকের সোনালী ফসল রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করাই হোক রাজনীতির মূল লক্ষ্য। মাটি ও মানুষের সমৃদ্ধি নিশ্চিত না করে কোনো তথাকথিত 'সংস্কার' টেকসই হবে না।
বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে সরকারকে বোরো চাষিদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ ও সারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে কেবল দালানকোঠা বা চাকচিক্য নয়, বরং মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবন রক্ষা করতে হবে।
২৮৮ বার পড়া হয়েছে