শাহজাহান হোটেলের অলিন্দে ঝরে পড়া জলছবি: ‘চৌরঙ্গী’ এবং এক মায়াবী মহানগরের প্রবহমান জীবনতৃষ্ণা
মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:২০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কলকাতার আকাশ তখন সদ্য মুছে নেওয়া স্লেটের মতো। পঞ্চাশের দশকের সেই ধোঁয়াটে, আধা-ঔপনিবেশিক কলকাতা—যেখানে ব্রিটিশ রাজত্বের বিদায়বেলার দীর্ঘশ্বাস আর নতুন গজিয়ে ওঠা কর্পোরেট সভ্যতার হাঁসফাঁস শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত গোধূলি তৈরি করেছে।
সেই গোধূলির আলোতেই জন্ম নিয়েছিল এক আখ্যান, যা নিছক কাগজের পাতায় বন্দি কোনো গল্প নয়, বরং এক অনন্ত দীর্ঘশ্বাসের নাম—'চৌরঙ্গী'। মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের কলমে উঠে আসা এই আখ্যান যেন এক জীবন্ত সত্তা। ১৯৬২ সালের সেই প্রথম প্রকাশের দিন থেকে শুরু করে আজকের এই ২০২৬ সালের যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়েও এর প্রতিটি শব্দ যেন বুকের খুব গভীরে গিয়ে আঘাত করে। সময়ের ধুলোবালি যতই জমুক না কেন, শাহজাহান হোটেলের সেই কাঁচঘেরা অন্দরমহলের ঘ্রাণ আজও ম্লান হয়নি। সেখানে কান পাতলেই শোনা যায় মানুষের না-বলা যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি, আর চোখে পড়ে নিয়ন আলোর নিচে লুকিয়ে থাকা একান্নবর্তী বিষাদ। এ যেন কেবল একটি হোটেলের গল্প নয়, এ হলো এক চলমান শহরের আত্মার দলিল।
উপন্যাসের শুরুতে যে শিক্ষিত, ভাগ্যহত যুবকের দেখা মেলে, তার জীবনের দিকে তাকালে নিছক এক ব্যক্তির গল্প মনে হয় না; মনে হয় যেন এক আস্ত প্রজন্মের হাহাকার মূর্ত হয়ে উঠেছে। ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে দিশেহারা হয়ে যখন তাকে ডাস্টবিন বিক্রির মতো পেশায় নামতে হয়, তখন তা কেবল পেটের দায় থাকে না, হয়ে ওঠে অস্তিত্ব রক্ষার এক মর্মান্তিক লড়াই। কলকাতার তপ্ত পিচঢালা রাজপথ, ধুলো ও ঘামের গন্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কীভাবে তিলে তিলে নিজেকে মুছে ফেলে আবার নতুন করে গড়ে তোলে, এ যেন তারই এক নিপুণ চিত্রায়ণ। মানুষ তো আগে এই পৃথিবীতে জন্ম নেয়, তারপর প্রতিদিনের ধুলো, কাদা, রোদ আর অপমানের ভেতর দিয়ে নিজের একটা পরিচয় তৈরি করে। খিদের কাছে তো কোনো দর্শন টেকে না, সেখানে টিকে থাকে কেবল বেঁচে থাকার এক আদিম প্রবৃত্তি। এই যে বাঁচার তাগিদে অবিরাম ছুটে চলা, এর মধ্যে কোনো কেতাবি দর্শন নেই, আছে কেবল এক নির্ভেজাল, রূঢ় বাস্তবতা। শাহজাহান হোটেলের রিসেপশনিস্ট হিসেবে যখন সেই যুবকের নতুন জীবন শুরু হয়, তখন সে কেবল একটি পেশা গ্রহণ করে না। বরং সে এমন এক মায়াবী জগতের নীরব দর্শক হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষের হাসি, কান্না, প্রেম আর প্রতারণাগুলো এক অন্য ব্যাকরণে লেখা হয়।
শাহজাহান হোটেল কোনো সাধারণ ইট-কাঠ-পাথরের ইমারত নয়। ঘূর্ণায়মান সেই কাঁচের ভারী দরজা পার হলেই যেন এক অন্য ব্রহ্মাণ্ডে প্রবেশ করতে হয়। বাইরের কলকাতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। বাইরে যেখানে ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষের পেটে খিদের আগুন, মধ্যবিত্তের ঘরে বেকারত্বের হাহাকার, ট্রামের ঘণ্টি আর মিছিলের স্লোগান—সেখানে হোটেলের ভেতরের পৃথিবীটা একদম আলাদা। এখানে পাউডারের সুবাস, হাভানা চুরুটের ধোঁয়া, বিলিতি মদের গন্ধ, দামি কার্পেটে ঢাকা নিস্তব্ধ মেঝে আর ঝাড়লণ্ঠনের মায়াবী আলো। এই জগতটি সমাজেরই বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সমাজের মূল স্রোত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এখানকার নিয়মকানুন আলাদা, এখানকার মানুষের হাসির মাপকাঠি আলাদা। বাইরের পৃথিবীর কোনো রুক্ষতা এখানে প্রবেশ করতে পারে না। এখানে দারিদ্র্য এক নিষিদ্ধ শব্দ। কেবলই চাকচিক্য আর আভিজাত্যের এক অনন্ত প্রদর্শনী চলে এখানে, যেখানে প্রতিটি মানুষের মুখ এক একটি নিপুণ মুখোশে ঢাকা। বাইরের পৃথিবী যখন রোদে পুড়ছে বা বৃষ্টিতে ভিজছে, তখন এই কাঁচের প্রাসাদের ভেতরের তাপমাত্রায় কোনো বদল আসে না। এ যেন এক অদ্ভুত মায়াদ্বীপ, যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়ে থাকে কেবল কিছু মানুষের উল্লাসের সাক্ষী হতে।
এই মায়ানগরীর একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে যে মানুষটি, তার নাম স্যাটা বোস। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন এক নির্লিপ্ত, বিষণ্ণ অথচ কর্তব্যপরায়ণ চরিত্রের দেখা মেলা ভার। বাইরে থেকে দেখলে স্যাটা বোস যেন পেশাদারিত্বের এক নিখুঁত যন্ত্র। তার ঠোঁটের কোণে সবসময় লেগেই আছে মেপে রাখা হাসি, অতিথিদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর তার নখদর্পণে। কিন্তু সেই নিখুঁত পোশাকের আড়ালে, ওই হাসিমুখের ঠিক পেছনেই যে কী গভীর এক শূন্যতা বাসা বেঁধে আছে, তা কজনই বা জানতে পারে? সে যেন এক আধুনিক কালের নিঃসঙ্গ পথিক। সে প্রতিদিন এই হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষের আসা-যাওয়া দেখে। সে জানে এখানকার প্রতিটি সম্পর্ক বালির বাঁধের চেয়েও ঠুনকো, এখানকার প্রতিটি প্রতিশ্রুতি মদের নেশা কেটে গেলেই ফুরিয়ে যায়। তবুও প্রতিদিন সে তার কাজ করে যায় অবিচল নিষ্ঠায়। যখন তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে সেই অমোঘ সত্য—"এই তো জীবন, কেউ আসে কেউ যায়, কেউ মনে রাখে কেউ রাখে না"—তখন তা নিছক কোনো সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে নাগরিক জীবনের চরম নিঃসঙ্গতার এক বেদনাবিধুর স্বীকারোক্তি। ভিড়ের মাঝে থেকেও স্যাটা বোস আসলে এক ভীষণ একা মানুষ, যে সবার খবর রাখে, কিন্তু যার মনের খবর রাখার মতো এই পৃথিবীতে কেউ নেই। তার এই নির্লিপ্ততা আসলে ভেতর থেকে ক্ষয়ে যাওয়া এক মানুষের আত্মরক্ষার বর্ম। সে জানে, এই আলো ঝলমলে জগতটা একটা মরীচিকা, তবু সেই মরীচিকার বুকেই সে তার জীবনের নোঙর ফেলেছে।
পঞ্চাশের দশকের সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা কলকাতাকে যদি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তবে দেখা যাবে সেখানে আভিজাত্যের মোড়কে কতটা পচন ধরেছিল। শাহজাহান হোটেল যেন সেই পচনের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। রাতের বেলা যখন হোটেলের আলোকোজ্জ্বল হলঘরে বিত্তবান পুঁজিপতিরা সুরা আর সুরের মূর্ছনায় মেতে ওঠে, তখন সেই আলোর নিচেই থাকে এক গাঢ় অন্ধকার। সেই অন্ধকারের বাসিন্দা হলো স্যাটা বোস, করবী গুহ বা সেই নবাগত রিসেপশনিস্টের মতো মানুষেরা। তাদের ঘাম, তাদের শ্রম, তাদের নীরব আত্মত্যাগের ইন্ধনেই জ্বলে ওঠে ওপরতলার মানুষদের ওই বিলাসের ঝাড়লণ্ঠন। একদল মানুষ যখন নিজেদের সর্বস্ব নিংড়ে দিয়ে সেবা করে যাচ্ছে, অন্যদল তখন টাকার গরমে মানুষের আত্মাকে পর্যন্ত কিনে নিতে চাইছে। এই বৈপরীত্য বড়ই নিষ্ঠুর। কর্পোরেট আভিজাত্যের এই যে চোখ-ধাঁধানো রূপ, তার আড়ালে যে কত বড় শঠতা, কত গভীর রিক্ততা লুকিয়ে আছে, তা এই হোটেলের প্রতিটি অলিন্দে ফিসফিস করে ঘোরে। বড়লোকদের এই বিলাসিতার ইমারত আসলে দাঁড়িয়ে আছে সাধারণ কিছু মানুষের না-বলা দীর্ঘশ্বাসের ভিতের ওপর।
এই রিক্ততার সবচেয়ে করুণ শিকার বোধহয় করবী গুহ। করবী কেবল একটি চরিত্র নয়, সে যেন এক জ্বলন্ত মোমবাতি, যে নিজেকে পুড়িয়ে চারপাশের অন্ধকার দূর করতে চেয়েছিল। একাধারে সে অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, স্বাধীনচেতা, আবার অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লালসার এক অসহায় ক্রীড়নক। করবী গুহর জীবনের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। উচ্চবিত্ত পুরুষদের বিনোদনের জন্য তাকে ব্যবহার করা হয়, অথচ সে নিজের আত্মমর্যাদাকে বাঁচিয়ে রাখার এক আপ্রাণ, অথচ ব্যর্থ চেষ্টা করে যায়। তার হাসি, তার মোহময়ী রূপ, তার রেশমি শাড়ির প্রতিটি ভাঁজের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক বুক না-বলা কান্না। তার মৃত্যু তো কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। ওই মৃত্যু আসলে সেই তথাকথিত সভ্য, অভিজাত সমাজের গালে এক সপাটে চড়, যে সমাজ অর্থের বিনিময়ে নারীর শরীর ও আত্মাকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। পুরুষতান্ত্রিক এই কর্পোরেট জাঁতাকলে পড়ে একটি তরতাজা প্রাণ কীভাবে নিঃশব্দে ঝরে যায়, করবী তার এক মর্মান্তিক প্রমাণ। সে যেন এক উজ্জ্বল প্রজাপতি, যে আলোর আকর্ষণে ছুটে গিয়েছিল, আর শেষে সেই কর্পোরেট লালসার আগুনে নিজের ডানা দুটি পুড়িয়ে ছাই করে ফেলল।
শাহজাহান হোটেলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের স্বকীয়তাকে খুব সন্তর্পণে গ্রাস করে নেয়। ওই যে নির্দিষ্ট মাপের ইউনিফর্ম, মেপে মেপে কথা বলা, সব পরিস্থিতিতে হাসিমুখে সেবা প্রদান—এসবের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ ক্রমশ একটি যন্ত্রে পরিণত হয়। তার নিজস্ব কোনো সত্তা থাকে না, সে কেবলই হোটেলের একটি অংশমাত্র হয়ে যায়। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় এক একটা রক্তমাংসের মানুষের নিজস্ব দুঃখ-কষ্ট। কিন্তু মানুষের হৃদয় কি এত সহজে হার মানে? ইট-পাথরের এই নিরেট কাঠামোর ভেতরেও তো ভালোবাসার জন্ম হয়। সুজাতা মিত্র এবং অনিন্দ্য পাকড়াশির প্রেম যেন সেই মরুভূমির বুকে ফুটে ওঠা এক একলা ফুল। কর্পোরেট দুনিয়ার হাজারো নিয়ম আর জটিলতার মাঝেও যে মানুষের হৃদয়ের আর্তি হারিয়ে যায় না, এই প্রেমকাহিনি তারই প্রমাণ। যদিও তাদের প্রেমের পরিণতি এক গভীর দীর্ঘশ্বাসে গিয়ে মেশে, তবু তা এক অনন্ত সত্যকে মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা কখনো কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা যায় না। জীবনের এই ট্র্যাজেডিগুলো কোনো প্রাচীন মহাকাব্যের মতো নয়, বরং তা আমাদের রোজকার চেনা জীবনের এক নিষ্ঠুর, নীরব পরিহাস। এই পরিণতি গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো নিয়তি নয়, এটি আধুনিক মানুষের নিজেদের তৈরি করা এক অদৃশ্য ফাঁদ।
মানুষের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস যেন এখানে মাপা হয় হোটেলের রুমের চাবি, কফির পেয়ালা আর রুপোলি ট্রে-তে ফেলে যাওয়া বকশিশের কয়েন দিয়ে। শাহজাহান হোটেলের প্রতিটি কোণে জমে আছে হাজারো মানুষের টুকরো টুকরো ইতিহাস। মিসেস পালমারির নীরব শোক হোক বা জেনানা ফ্যালাসের জীবনের দুর্বিষহ সংগ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে এই হোটেল যেন এক বিশাল প্রতীক্ষালয়। এখানে সবাই যেন কোনো এক অজানা গন্তব্যের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে। ট্রেন আসার সময় পেরিয়ে যায়, বুকিং বাতিল হয়ে যায়, তবু মানুষ বসে থাকে অলীক কোনো আশায়। জীবনের এই যে ক্ষণভঙ্গুরতা, এই যে আজ আছি কাল নেই বোধ—তা এই আখ্যানের প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। এখানে সাধারণ একটি হোটেলের ঘরও যেন একেকটি রহস্যময় মহাবিশ্ব। দরজা বন্ধ হলেই সেই ঘরের ভেতর তৈরি হয় নতুন এক পৃথিবী। কেউ সেখানে ভালোবাসার কাঙাল হয়ে আসে, কেউ আসে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে, আবার কেউ আসে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়তে। আর পরের দিন সকালে অতিথি চলে গেলেই বেডশিট পাল্টে, ঘর মুছে তা আবার তৈরি করা হয় নতুন কোনো অতিথির জন্য। আগের রাতের কান্না বা হাসির কোনো চিহ্নই আর সেখানে অবশিষ্ট থাকে না।
যিনি এই অসামান্য জগতটি সৃষ্টি করেছেন, সেই লেখক কোনো নৈতিক বিচারকের আসনে বসেননি। তিনি কেবল একজন দক্ষ চিত্রশিল্পীর মতো আলো আর অন্ধকারের খেলাটিকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনকে এত কাছ থেকে, এত গভীরভাবে না দেখলে এমন সৃষ্টি সম্ভব নয়। হোটেলের ডাস্টবিনের পাশে দাঁড়িয়ে, মদের গ্লাসের তলানিতে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্টের মাঝেও যে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তিনি পরম মমতায় তুলে এনেছেন। সত্য কেবল আকাশের ধ্রুবতারায় থাকে না, তা থাকে রাস্তার ধুলোয়, মানুষের ঘামে, আর রাতের কলকাতার নিঃসঙ্গতায়। সাধারণ ঘটনাগুলোও তার বর্ণনার গুণে এক জাদুকরী মাত্রা পেয়ে যায়। মনে হয়, এই শাহজাহান হোটেল কেবল চৌরঙ্গীতে নয়, পৃথিবীর প্রতিটি বড় শহরের কোনো না কোনো ঠিকানায় একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। নিউ ইয়র্ক, লন্ডন বা প্যারিস—ভৌগোলিক সীমানা যাই হোক না কেন, মানুষের একাকিত্ব আর ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা সব জায়গায় একইরকম।
সময়ের অমোঘ নিয়মে একদিন সবকিছুই বদলায়। উপন্যাসের শেষে শাহজাহান হোটেলেরও মালিকানা বদল হয়, স্যাটা বোসকে একদিন চলে যেতে হয় তার চিরচেনা সেই ডেস্ক ছেড়ে, আর সেই ভাগ্যহত যুবকও পা বাড়ায় এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে। পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। না প্রেম, না ক্ষমতা, না আভিজাত্য, না এই শাহজাহান হোটেল। সময়ের স্রোতে সবকিছু একদিন ধুলোয় মিশে যায়, পড়ে থাকে কেবল কিছু ধোঁয়াটে স্মৃতি আর বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা। কিন্তু সেই স্মৃতিই তো সাহিত্যের মূল উপাদান। যিনি এই আখ্যান রচনা করেছেন, তিনি যেন সেই স্মৃতির সওদাগর, যিনি তার কলমের আঁচড়ে এক মৃত শহর আর এক হারিয়ে যাওয়া হোটেলকে অনন্তকালের জন্য অমরত্ব দান করেছেন।
আজ, এই বর্তমান পৃথিবীর দ্রুত ধাবমান কোলাহলে দাঁড়িয়ে যখন চৌরঙ্গীর সেই পুরোনো পাতাগুলো ওলটানো হয়, তখন মনে হয় কিছুই তো বদলায়নি। কলকাতার রাস্তায় হয়তো আজ ঘোড়ার গাড়ির বদলে দামি বিদেশি গাড়ি ছোটে, পুরনো ইমারতের জায়গায় মাথা তুলেছে আকাশছোঁয়া শপিং মল আর কাঁচের বহুতল, কিন্তু মানুষের ভেতরের সেই আদিম হাহাকারটা কি একটুও বদলেছে? আজও তো মানুষ ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ঘোরে, আজও তো জীবিকার দায়ে মানুষ নিজের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে মারে, আর আজও তো কোনো এক স্যাটা বোস হাসিমুখে নিজের সব কষ্ট লুকিয়ে রেখে অন্যকে পথ দেখায়। শাহজাহান হোটেলের সেই ঘোর-লাগা রিসেপশন ডেস্ক থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার কোনো শেষ নেই। কারণ মানুষের জীবনটাই হলো এক অনন্ত হোটেল, যেখানে জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের এই সামান্য সময়টুকুতে সবাই কেবল ক্ষণিকের অতিথি।
কেউ আসে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিতে, কেউ আসে সারা জীবনের সঞ্চয় বিলিয়ে দিতে। তারপর একদিন সময় ফুরিয়ে গেলে চুপিচুপি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হয় অনন্তের পথে। হোটেলের খাতা থেকে মুছে যায় নাম, শুধু অলিন্দের বাতাসে রয়ে যায় কিছু অস্পষ্ট পদধ্বনি আর না-বলা কথার রেশ। কাল হয়তো এই পৃথিবীর বুকে আমাদের কারো নাম কেউ মনে রাখবে না, কিন্তু কালের ক্যানভাসে মানুষের এই বেঁচে থাকার লড়াই, এই হার-না-মানা অস্তিত্বের সংগ্রাম চিরকাল এক অজানা মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। মানুষের এই ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তীব্র সুন্দর যাত্রার চেয়ে বড় রূপকথা আর কীই বা হতে পারে?
১২৫ বার পড়া হয়েছে