কুমারখালীর এক নীরব আলোকবর্তিকা
বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬ ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুমারখালীর এক নীরব আলোকবর্তিকা জন্মদিন মানেই সাধারণত কেক, আনুষ্ঠানিকতা, আয়োজন আর ব্যস্ততার দিন। কিন্তু কিছু মানুষের জন্মদিন এমনই নিভৃত ও নীরব হয়—তবুও ভালোবাসার আলোয় ভরে ওঠে চারপাশ। কুমারখালীর কৃতি সন্তান, কবি–লেখক এবং বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব শ্রদ্ধেয় কাজী আখতার হোসেন ভাইয়ের জন্মদিনও যেন তেমনই এক দিন।
কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন নেই, নেই বড় কোনো উদ্যাপন। তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বজন, বন্ধু–বান্ধব আর শুভানুধ্যায়ীদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি। অনেকেই তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবন কামনা করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। কেউ কেউ ফিরে গেছেন শৈশব–কৈশোরের স্মৃতিতে, তুলে ধরেছেন তাঁর সঙ্গে কাটানো দিনের গল্প। আসলে কেনই বা তাঁর জন্মদিনে মানুষ ভালোবাসা জানাবে না! তিনি তো শত ঐতিহ্যের সোনালী নগর কুমারখালীর গর্ব, আমাদের সবার পরিচিত ও শ্রদ্ধার মানুষ—কাজী আখতার হোসেন।
দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তাঁকে কাছ থেকে দেখার, চেনার ও জানার সুযোগ হয়েছে আমার। ঐতিহ্যবাহী কুমারখালী পাবলিক লাইব্রেরীতে তাঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। ভালোবাসার সেই লাইব্রেরীতে তিনি আসতেন প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক মীর আমজাদ আলী ভাইয়ের আন্তরিক আমন্ত্রণে। এই পাবলিক লাইব্রেরী কেবল একটি ভবন নয়—এটি কুমারখালীর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করতে আখতার ভাইয়ের অবদান অনস্বীকার্য। লাইব্রেরীকে দ্বিতীয় তলায় উন্নীত করার পেছনে তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টা আজও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।
লাইব্রেরীর সেই দিনগুলোতে তাঁকে দেখেছি প্রাণবন্ত গল্প আর আড্ডায় মেতে উঠতে। আবার কোনো আলোচনায় গুছিয়ে, পরিমিত ভাষায় গভীর ভাবনার কথা বলতে। একজন নীরব শ্রোতা হিসেবে তাঁর অনেক বক্তব্য মন দিয়ে শুনেছি—যেখানে ছিল ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ। প্রয়াত মীর আমজাদ আলী ভাই-ই একদিন তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই পরিচয়ের পর থেকেই তিনি আমার কাছে শ্রদ্ধাভাজন মানুষদের একজন হয়ে উঠেছেন।
কাজী আখতার ভাইয়ের মধ্যে নেই কোনো পদ-পদবীর অহংকার। অথচ তিনি দেশের বিভিন্ন জেলা ও মন্ত্রণালয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন সাবেক সচিব হয়েও তাঁর মধ্যে যে বিনয়, সৌজন্য আর মানবিকতা দেখেছি—তা সত্যিই বিরল। তিনি নরম কণ্ঠে কথা বলেন, কিন্তু তাঁর ভাবনা গভীর। লেখালেখিতেও তিনি অনন্য। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্মৃতিচারণ নিয়ে তাঁর লেখা পড়তে শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না। শব্দের ভেতর দিয়ে তিনি যেন সময়কে ধরে রাখতে পারেন।
দেশের নানা দায়িত্বে ব্যস্ত থাকলেও সুযোগ পেলেই ছুটে আসতেন তাঁর প্রিয় শহর কুমারখালীতে। কারণ এই শহরের প্রাণকেন্দ্রেই রয়েছে তাঁর পৈত্রিক নিবাস। এখানেই কেটেছে তাঁর শৈশব, কৈশোর—খেলাধুলা, নাটক আর সাহিত্যচর্চার দিনগুলো। এই শহরেই আছে তাঁর বাল্যবন্ধুরা। তাঁদের সঙ্গে আড্ডা, স্মৃতিচারণ আর হাঁটাহাঁটির সেই বন্ধুত্ব আজও অটুট।
তাঁর প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে মেসার্স বুলবুল টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রফিক বিশ্বাস ভাইয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রফিক ভাইয়ের মুখেও আখতার ভাইয়ের অসংখ্য স্মৃতিময় গল্প শুনেছি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আর কর্মজীবনের অসংখ্য ছবিতে যেন ধরা আছে তাঁর দীর্ঘ পথচলার গল্প—একজন মেধাবী ছাত্র থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, আর একই সঙ্গে একজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষের জীবনযাত্রা।
আজ তাঁর জন্মদিনের এই শুভক্ষণে প্রাণের কুমারখালীর প্রিয় কৃতি সন্তান কাজী আখতার হোসেন ভাইকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর আন্তরিক শুভেচ্ছা। তিনি আমাদের ভরসার একটি বড় জায়গা জুড়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—এই বিশ্বাস হৃদয়ে রেখেই বলি—আপনার মতো মানুষই একটি জনপদের গর্ব, প্রেরণা এবং নীরব আলোকবর্তিকা। শ্রদ্ধেয় আখতার ভাই, আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘ জীবন ও অবিরাম সৃজনশীল পথচলা কামনা করি।
লেখক: সাংবাদিক।
(লখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১৩৬ বার পড়া হয়েছে