উপকূলে ম্যানগ্রোভ বনায়নে ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগ
দুর্যোগ মোকাবিলায় বাড়ছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা
বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬ ৬:০০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়তে থাকায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় গাছপালা ও বনভূমি উজাড় হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় চারটি উপজেলায় গাছপালা ও বনভূমি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে দেশের সামাজিক সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ। সংস্থাটি জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত নদীর তীরে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদের নার্সারি গড়ে তুলেছে।
এসব নার্সারিতে উৎপাদিত হচ্ছে সুন্দরবনের পরিচিত প্রজাতি যেমন কেওড়া, গেওয়া ও কাঁকড়া গাছের চারা। পরবর্তীতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব চারা উপকূলীয় এলাকায় রোপণ করা হচ্ছে। এর ফলে গত কয়েক বছরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে ম্যানগ্রোভ বনভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বনায়নের কারণে নদীভাঙন অনেকাংশে কমেছে এবং বেঁড়িবাঁধ সুরক্ষিত থাকছে। পাশাপাশি গাছপালার কারণে গো-খাদ্যের সংস্থান হওয়ায় পশুপালন সহজ হয়েছে। পরিবেশে ভারসাম্য ফিরেছে এবং তীব্র গরমেও আবহাওয়া তুলনামূলক সহনীয় রয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ঝাঁপা গ্রামের বাসিন্দা ঠাকুরাণী গাইন বলেন, নদীর চরে গড়ে ওঠা ম্যানগ্রোভ বন বেঁড়িবাঁধকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করছে। এতে এলাকায় দৃষ্টিনন্দন ‘মিনি সুন্দরবন’-এর সৃষ্টি হয়েছে।
একই ইউনিয়নের কোলা গ্রামের মারিয়াম খাতুন জানান, নদীতীরে গাছপালা থাকায় জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা কমে আসে, ফলে ফসলি জমি ও মিঠা পানির পুকুর রক্ষা পাচ্ছে।
আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন, এই বনায়ন কর্মসূচির ফলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন পথ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পশুপালন ও হাঁস-মুরগি পালনে উৎসাহ বাড়ছে।
ফ্রেন্ডশিপের ম্যানগ্রোভ প্লানটেশন কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ টেকনিক্যাল ম্যানেজার মাইদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ১৬টি নার্সারিতে প্রায় ১৬ লাখ চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০৫ হেক্টর জমিতে ৯ লাখ ২১ হাজার ম্যানগ্রোভ চারা রোপণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এসব বনায়নের ফলে প্রায় ৮১ কিলোমিটার বেঁড়িবাঁধ ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। পাশাপাশি নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে—যেখানে তারা শাক-সবজি ও দেশি ফলের চাষাবাদ করছেন এবং হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
ফ্রেন্ডশিপের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে এই বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে।
উপকূলীয় এলাকায় এই ব্যতিক্রমী ম্যানগ্রোভ বনায়ন স্থানীয় পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৩৮ বার পড়া হয়েছে