গান পয়েন্টে গণমাধ্যম
মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ ১০:০১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রিসেন্ট একটি সংবাদে দেখলাম, ট্রা#ম্প ঘোষণা দিয়েছেন আ#মে#রি#কা#র পক্ষে নিউজ না করলে গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করে দিবে।
এর অর্থ হল গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা। এমন সমস্যা আমাদের দেশেও আছে। সরকারের নিজের স্বৈরাচারী আচরণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়ে। পৃথিবীর সকল দেশের স্বৈরাচার সরকাররা সর্ব প্রথমে এটি'ই করে থাকেন। আমাদের দেশ ও এর বাহিরে নয়।
জার্নালিজম বা সাংবাদিকতা একটি সমাজের আয়না—যেখানে সত্য, তথ্য এবং মানুষের কণ্ঠ প্রতিফলিত হয়। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিকরা শুধু খবর পরিবেশনই করেন না, বরং তারা সমাজের অসংগতি তুলে ধরেন, মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টি করেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সাংবাদিকতা আরও দ্রুত ও সহজলভ্য হয়েছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এর সাথে সাথে ভুয়া খবর বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের উচিত যাচাই-বাছাই করে সত্য তথ্য প্রকাশ করা।
সাংবাদিকতার মূল নীতি হলো নিরপেক্ষতা, সততা এবং সাহস। একজন ভালো সাংবাদিককে সবসময় সত্যের পক্ষে থাকতে হয়, এমনকি তা যদি কঠিন বা ঝুঁকিপূর্ণ হয় তবুও। কারণ জনগণের আস্থা অর্জনই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি।
অতএব, জার্নালিজম শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান দায়িত্ব। সঠিকভাবে এই দায়িত্ব পালন করা গেলে সমাজে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে মুদ্রার অপর পিঠে ইয়েলো জার্নালিজম বা হলুদ সাংবাদিকতা।ইয়েলো জার্নালিজম হলো এমন এক ধরনের সাংবাদিকতা যেখানে সত্যতা বা নৈতিকতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় চটকদার শিরোনাম, অতিরঞ্জন এবং আবেগ উসকে দেওয়ার ওপর। এর মূল উদ্দেশ্য থাকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা বা লাভ অর্জন করা, সত্য তথ্য উপস্থাপন নয়।
এই ধরনের সাংবাদিকতায় প্রায়ই গুজব, অর্ধসত্য কিংবা বিকৃত তথ্য প্রকাশ করা হয়, যা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ইয়েলো জার্নালিজম আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে, কারণ এখানে যাচাই না করেই অনেক তথ্য দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
ইয়েলো জার্নালিজম সমাজের জন্য ক্ষতিকর, কারণ এটি মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করে এবং গণমাধ্যমের ওপর আস্থা কমিয়ে দেয়। তাই একজন সচেতন পাঠক হিসেবে আমাদের উচিত খবরের উৎস যাচাই করা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে সমর্থন করা।
সাংবাদিকদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ গুলো কি কি হতে পারে? বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা সাংবাদিকতার নৈতিকতা (ethics) মেনে চলছেন না—এটি একটি সাধারণ অভিযোগ। তবে সবাই এমন নয়; অনেক দায়িত্বশীল সাংবাদিক এখনও সততা ও নীতির সঙ্গে কাজ করছেন। তবুও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যেগুলোর কারণে এই সমস্যা দেখা যায়:
প্রথমত, বাণিজ্যিক চাপ। অনেক সংবাদমাধ্যম এখন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বেশি ভিউ, ক্লিক বা TRP পাওয়ার জন্য তারা কখনও কখনও চটকদার বা যাচাইহীন খবর প্রকাশ করে, যা ইয়েলো জার্নালিজমকে উৎসাহিত করে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ। কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকে নির্দিষ্ট পক্ষের পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এতে নিরপেক্ষতা নষ্ট হয় এবং সত্য গোপন থাকে।
তৃতীয়ত, দ্রুত খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতা। ডিজিটাল যুগে সবার আগে খবর দিতে গিয়ে অনেক সময় যাচাই-বাছাই ঠিকভাবে করা হয় না, ফলে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
চতুর্থত, পেশাগত নিরাপত্তার অভাব। অনেক সাংবাদিক কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাজ করেন। এতে তারা কখনও কখনও নৈতিকতার সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন।
পঞ্চমত, প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। সব সাংবাদিক যথাযথ প্রশিক্ষণ বা নৈতিক শিক্ষা পান না, যার ফলে তারা পেশার মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারেন।
সবশেষে বলা যায়, এই সমস্যা শুধু সাংবাদিকদের নয়—গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো, সমাজের চাহিদা এবং পাঠকের আচরণও এর সঙ্গে জড়িত। তাই সমাধানের জন্য সাংবাদিক, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ—সবারই সচেতন হওয়া।
গণমাধ্যম কর্মীদের নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে দিন দিন সাংবাদিকতা বা জার্নালিজম হারিয়ে হলুদ সাংবাদিকতা বা ইয়েলো জার্নালিজম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। মানুষ এখন হলুদ সাংবাদিকদেরকে সাংবাদিক হিসেবে চিনে থাকেন।
বর্তমানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন স্তরের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি, সাংবাদিকদের সঠিক পারিশ্রমিক প্রধান করা জরুরী প্রয়োজন। গণমাধ্যমকে ব্যবসায়ীদের হাতিয়ার না বানিয়ে গণমাধ্যমকে জনগণের তথ্য প্রবাহের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিকদের নৈতিকতা ফেরাতে, গণমাধ্যম কর্মীদের মৌলিক অধিকার আদায়ে সঠিক তদারকি পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খুব জরুরী। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা একটি জটিল কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর জন্য সরকার, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিচে কিছু কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো—
১. আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সংস্কার
যেসব আইন মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে বা অপব্যবহারের সুযোগ দেয়, সেগুলোর সংস্কার জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. রাজনৈতিক প্রভাব কমানো
গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক চাপ ও হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। সংবাদপত্রের মালিকানা ও পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনলে নিরপেক্ষতা বাড়বে।
৩. সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
হুমকি, হামলা বা হয়রানি থেকে সাংবাদিকদের রক্ষা করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারলে তারা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারবেন।
৪. পেশাগত নৈতিকতা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা
সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা দরকার, যাতে তারা দায়িত্বশীল ও মানসম্মত সাংবাদিকতা করতে পারেন।
৫. স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন
একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন মিডিয়া কমিশন বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
৬. জনসচেতনতা বৃদ্ধি
সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং সত্যভিত্তিক সংবাদকে সমর্থন করতে হবে। ভুয়া খবর বর্জন করলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা উৎসাহিত হবে।
৭. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা
অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সঠিক তথ্য প্রচার নিশ্চিত করতে নীতিমালা ও নজরদারি প্রয়োজন, যাতে ভুয়া তথ্য কমে।
সবশেষে বলা যায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা শুধু সাংবাদিকদের দায়িত্ব নয়—এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। সবার সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে তোলা সম্ভব।
সব শেষ বলতে চাই গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের নৈতিকতা ও স্বাধীনতা নষ্ট করার পেছনে সাংবাদিক এই দায়ী। সাংবাদিক নেতারা ধাপে ধাপে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে গিয়ে গণমাধ্যমের ও গণমাধ্যম কর্মীদের স্বাধীনতা নষ্ট করেছে, যা উদ্ধার করতে আরও ১০০ বছর পার হয়ে যাবে। এমন অবস্থা হয়েছে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেটে যাওয়ার মত। এক পা এগোবেন তো দু'পা পিছোবেন।
এক কথায় যদি বলতে হয় "আমি যা নষ্ট করেছি, সেটা আমার পক্ষে আর ঠিক করা সম্ভব নয়।"
লেখক : সাংবাদিক।
২০১ বার পড়া হয়েছে