সাতক্ষীরায় সূর্যমুখীর হলুদ স্বপ্ন- কম খরচে বেশি লাভের আশা
মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ ৯:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দিগন্তজুড়ে সবুজের মাঝে হলুদের সমারোহ। বাতাসে দুলছে সূর্যমুখী ফুল, সূর্যের গতিপথ অনুসরণ করে মুখ তুলে আছে সারি সারি গাছ।
এমন নয়নজুড়ানো দৃশ্য এখন সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায়। সূর্যমুখী ফুলের প্রতিটি গাছ পরম যত্নে বেড়ে উঠেছে। ফাল্গুন মাসের মিষ্টি রোদে সবুজ পাতার আড়ালে মুখ উঁচু করে হাসছে সূর্যমুখী ফুল। নয়নজুড়ানো এ দৃশ্য সবার নজর কাড়ছে। ফলন ভালো হওয়ায় সূর্যমুখীর সঙ্গে হাসছেন কৃষকরাও।
ফলে দিন দিন সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কম খরচে অধিক লাভের সম্ভাবনা থাকায় জেলায় বাড়ছে সূর্যমুখী চাষের পরিমাণ। স্বল্প সময়ে তেলজাতীয় ফসল হিসেবে সূর্যমুখী উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। আর হলুদের এই অপরূপ রূপ দেখতে সূর্যমুখী ক্ষেতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে সাতটি উপজেলায় মোট ২২৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। গত বছর এ আবাদ ছিল ১০৯ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ১১৯ হেক্টর। এর মধ্যে তালায় ৬৩ হেক্টর, শ্যামনগরে ৬০, কালিগঞ্জে ৩৪, সদর উপজেলায় ২৭, কলারোয়ায় ২২, আশাশুনিতে ১৫ এবং দেবহাটায় ৭ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।
তালা উপজেলার খলিশখালি গ্রামের কৃষক সুজয় কুমার দাশ বলেন, তাদের গ্রামের আশপাশের মাঠে গেলে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ হলুদ আভা। দূর থেকে মনে হয় যেন হলুদ গালিচা বিছানো। কাছে গেলে দেখা যায় সারি সারি সূর্যমুখী ফুল বাতাসে দুলছে।
তিনি বলেন, শুধু সৌন্দর্য নয়, এই ফুল এখন আয়েরও বড় উৎস। তার মতে, প্রতি কেজি বীজ থেকে অন্তত আধা লিটার তেল উৎপাদন সম্ভব।
তিনি আরও জানান, প্রতি বিঘায় ১৪০ থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত তেল পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে প্রতি লিটার সূর্যমুখী তেলের দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় খরচ হয় সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার টাকা। তেল ছাড়াও বীজের খৈল পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
তালা উপজেলার ভারসা গ্রামের কৃষক আকবর হোসেন জানান, সূর্যমুখী চাষের মূল লক্ষ্য তেল উৎপাদন। তার ভাষ্য, প্রতি বিঘা জমিতে সাত থেকে ১০ মণ পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। লবণাক্ত জমিতে অন্য ফসল ভালো না হলেও সূর্যমুখী তুলনামূলক ভালো ফলন দিচ্ছে। স্বল্প সেচ ও কম পরিচর্যায় এ ফসল উৎপাদন সম্ভব। তাই কৃষকেরা ঝুঁকছেন এ আবাদে।
শ্যামনগর উপজেলার কৃষক আবিদুর রহমান পলাশ বলেন, উপকূলীয় জনপদে লবণাক্ততা দীর্ঘদিন ধরেই কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সেই লবণাক্ত পতিত জমিতেই এখন হলুদ রঙের নতুন স্বপ্ন দেখছেন কৃষকেরা।
তিনি আরও বলেন, ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কম খরচ, স্বল্প সময় এবং সরকারি প্রণোদনা—এই তিন কারণে সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মনিরুল ইসলাম বলেন, সূর্যমুখী একটি সম্ভাবনাময় তেলবীজ ফসল। কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি মানসম্মত বীজ ও সার সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের ভোজ্যতেলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। স্থানীয়ভাবে সূর্যমুখী উৎপাদন বাড়লে আমদানির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সে প্রেক্ষাপটে বিকল্প তেলবীজ ফসল হিসেবে সূর্যমুখী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে ছোট আকারের তেল নিষ্কাশন যন্ত্র স্থাপন করা গেলে স্থানীয় বাজারে সরাসরি সরবরাহও বাড়ানো সম্ভব।
তিনি আরও জানান, উৎপাদন বাড়াতে চলতি মৌসুমে ৬০০ কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকে এক কেজি করে টিএসএফ জাতের বীজ এবং দুই ধরনের সার মিলিয়ে ২০ কেজি পেয়েছেন। বীজ ও সার বাবদ মোট ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এই প্রণোদনা কৃষকদের উৎসাহিত করেছে বলে জানান তিনি।
তবে কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা—সরকারিভাবে ক্রয়ব্যবস্থা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা হলে সূর্যমুখী চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। তেলের বাড়তি চাহিদা ও বাজারদর বিবেচনায় সাতক্ষীরার মাঠে এখন সূর্যমুখী শুধু ফুল নয়, সম্ভাবনারও প্রতীক হয়ে উঠেছে।
১০৬ বার পড়া হয়েছে