টুঙ্গিপাড়ায় যৌতুকের অভিযোগে নববধূর মৃত্যুর ঘটনায় বিতর্কিত মিমাংসা
বৃহস্পতিবার , ১২ মার্চ, ২০২৬ ১০:২৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় যৌতুকের দাবিতে নববধূ নুসরাত হোসেন সানজিদা ওরফে তন্নীকে (১৮) বিষ খাইয়ে মারা যাওয়ার অভিযোগ উঠলেও, তার বাবা জাহাঙ্গীর খানের বিরুদ্ধে ৬ লাখ টাকায় মিমাংসা করার অভিযোগও সামনে এসেছে।
জানা গেছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় পাঁচ জন ব্যক্তি ও এক আইনজীবীর মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে লিখিতভাবে নববধূর শ্বশুর জাফর খানের সঙ্গে ৬ লাখ টাকায় হত্যার বিষয়টি মিমাংসা করেন তন্নীর পিতা জাহাঙ্গীর খান। বিষয়টি কয়েকদিন পর প্রকাশ্যে আসলে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) যৌতুকের দাবিতে শারীরিক নির্যাতনের পর নুসরাত হোসেন সানজিদা ওরফে তন্নীকে (১৮) বিষ খাইয়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার রাতে তন্নীকে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টুঙ্গিপাড়া উপজেলার চর-গোপালপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর খানের মেয়ে তন্নীর সঙ্গে একই গ্রামের জাফর খানের ছেলে আরিফুল খানের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রায় এক মাস আগে রাতে আরিফুল তন্নীর সঙ্গে দেখা করতে আসলে স্থানীয়রা তাদের ধরে বিয়ে দেন। কিন্তু তারপরও আরিফুল তন্নীকে শ্বশুরবাড়ি নেননি।
এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি নিজের ইচ্ছায় তন্নী শ্বশুরবাড়ি যান। পরদিন বাবার বাড়ি ফিরে তন্নী জানায় যে শ্বশুরবাড়ির পাশে দুই বিঘা জমি লিখে দিতে হবে। ওই দিন শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার পর পরদিন তন্নীকে বিষ খাওয়ার অবস্থায় তার বাবার বাড়ির সামনের রাস্তায় ফেলে দেয় স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা।
পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তন্নী মারা গেলে তার বাবা জাহাঙ্গীর খান অভিযোগ করেন, তার মেয়েকে ৪-৫ জন মিলে শারীরিক নির্যাতন করে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার কয়েকদিন পর তারাইল-চরগোপালপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর শিকদার, সোহেল শেখ, টুটুল শিকদার, পার্শ্ববর্তী কোটালীপাড়ার সোনাখালী সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ারসহ তন্নীর বাবা শ্বশুরের সঙ্গে ৬ লাখ টাকায় হত্যার বিষয়টি মিমাংসা করে নেন। পরে মৃত তন্নীর বাবা সেই টাকা ব্যাংকে জমা দেন।
মিমাংসায় উপস্থিত টুটুল শিকদার বলেন, “মৃত তন্নীর বাবা হঠাৎ এসে আমাকে ডেকেছিল। গোপালগঞ্জের এ্যাডভোকেট রবিউল আলমের কার্যালয়ে বসে হত্যার বিষয়টি ৬ লাখ টাকায় লিখিতভাবে আপোষ মিমাংসা হয়। শ্বশুর জাফর খানের কাছ থেকে নগদ ৬ লাখ টাকা নিয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকে জমা দেন। এতে আমার কোনো স্বার্থ নেই; এলাকার লোক হিসেবে ডাকায় গিয়েছিলাম।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রামবাসী মন্তব্য করেছেন, “একটি হত্যার ঘটনা ৫-৬ লাখ টাকায় মিমাংসা করা যায় তাহলে দেশে আইনশৃঙ্খলা থাকবে কীভাবে! কেউ কাউকে হত্যা করে টাকা দিয়ে মিটিয়ে দেবে এবং দোষীরাও ঘুরে বেড়াবে।”
তন্নীর বাবা জাহাঙ্গীর খান মিমাংসার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “এলাকার অনেক লোক নানা কথা বলতেই পারে। কিন্তু এখনও কোনো মিমাংসা হয়নি। সাংবাদিকদের নাম্বার দিন, মিমাংসা হলে আমি যোগাযোগ করব।”
মৃত তন্নীর মা শরিফা বেগম বলেন, “আমার স্বামীকে নানা রকমভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাই তিনি ভয়ে মিমাংসা করতে চাইছেন। শুনেছি ৬ লাখ টাকার কথা হয়েছে। কিন্তু সেই টাকা তিনি নিয়েছেন কি না, আমি জানি না। আমার মেয়ের জীবন সেই টাকায় ফিরে আসবে না। আমি চাই আমার মেয়ের হত্যার ন্যায়বিচার হোক।”
গোপালগঞ্জ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি রবীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেন, “বাংলাদেশে আইনের চোখে টাকার বিনিময়ে হত্যা মামলার মিমাংসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এমন ঘটনা সমাজে খারাপ প্রভাব ফেলে এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। তাই হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে মিমাংসায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।”
টুঙ্গিপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আইয়ুব আলী জানান, “এই ঘটনায় টুঙ্গিপাড়া থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাইনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী হত্যার আলামত পাওয়া গেলে হত্যা মামলা হবে। তবে আইনত হত্যার মতো ঘটনায় মিমাংসার কোনো সুযোগ নেই।”
১১৬ বার পড়া হয়েছে