ইবিতে শিক্ষিকা খুন: শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, দাফন সম্পন্ন, মামলা দায়ের
বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ ৪:১২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা খুনের ঘটনায় সাবেক ডে-লেবারকে দায়ী করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর ময়নাতদন্ত, জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া ইবি থানায় এজহার দায়ের ও মামলা গ্রহণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় ক্যাম্পাসের ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী শিক্ষা অনুষদের সামনে থেকে শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীর ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। পরে প্রশাসন ভবন চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হন তারা। বিক্ষোভে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান, বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা দোষীকে চিহ্নিত করে ফাঁসিসহ বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করেন।
বিক্ষোভে শিক্ষার্থী জোবায়ের হোসেন মাসুদ জানান, ‘ফজলু গতকাল ডিপার্টমেন্টে যে সময় আসে, তখন স্টাফ, শিক্ষক বা সেকশন অফিসার উপস্থিত ছিলেন না। যে সময় অধ্যাপিকা একা ছিলেন, সেই সময়েই ফজলু ঢুকে হত্যা করেছে। বিভাগের সিনিয়ররা জানেন, ম্যাম খুবই অনেস্ট ব্যক্তি ছিলেন এবং নিয়মমাফিক কাজ করতেন।
ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান হওয়ার পর পূর্বের চেয়ারম্যানের আমলে যে ভোগ-দখল চলত, তা সাদিয়া ম্যাম রোধ করেছিলেন। তিনি সবকিছু নিয়ম মাফিক যাচাই করতেন। এ কারণে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল, তা মাঝে মাঝে প্রকাশ্যে আসত। আমরা শিক্ষার্থীরা তাদের সতর্ক করেছি। আমরা চাই, সমস্ত তদন্ত হোক এবং দেখানো হোক কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কিনা। এছাড়া ফজলুকে এ ঘটনার জন্য কেউ প্রভাবিত করেছে কি না, তাও বিচার হওয়া উচিত।’
এদিকে সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ওই শিক্ষিকার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত শেষে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. হোসাইন ঈমাম বলেন, ‘অধ্যাপিকা আসমা সাদিয়া রুনার গলার ডান পাশের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। এটি ধারালো ছুরি বা অন্য কোনো ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হয়েছে। গলার বড় রক্তনালী কেটে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু হয়েছে।’
ডা. হোসাইন ঈমাম আরও জানান, অধ্যাপিকার শরীরের বুকে, পিঠে, পেটে ও হাতে প্রায় অন্তত ২০টি আঘাত রয়েছে। তবে এসব আঘাত গভীর নয়।
বিকেল যোহরের পর কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহে অধ্যাপিকার জানাজা ও পৌর গোরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজার জন্য ঝিনাইদহ থেকে একটি ও ক্যাম্পাস থেকে তিনটি বাস কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দেয় প্রশাসন।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকার স্বামী মো. ইমতিয়াজ সুলতান ইবি থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। জানা গেছে, এজাহারে বিভাগের ডে-লেবার ফজরুল রহমান, সাবেক রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও সহকারী অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘ভিকটিমের স্বামী এজহার দায়ের করেছেন। এজাহারের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড হয়েছে এবং চারজনকে আসামি করা হয়েছে।’
শিক্ষিকার চার সন্তানের আহাজারিতে পরিবারের সদস্যরা নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। স্বামী মো. ইমতিয়াজ সুলতান ইবির ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে পলিটেকনিক ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কর্মরত। অধ্যাপিকার চার সন্তান আসমার-তাইয়্যেবা, তাবাসসুম, সাজিদ আবরার ও ছয় মাস বয়সী আমেনা।
জানাজার পর উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘আমি ভিসি হওয়ার পর থেকে আসমা সাদিয়া রুনার মতো ভালো মানুষ খুব কম দেখেছি। ঘটনার কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। হত্যাকারী চিহ্নিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও তার পরিবার রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কাছে হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছে এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা আল্লাহর কাছে তার পরিবারের জন্য ধৈর্য কামনা করি।’
এর আগে বুধবার রাত ১১টায় বিভাগের সভাপতি সংশ্লিষ্ট কক্ষগুলো সিলগালা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল বডি। উপস্থিত ছিলেন প্রক্ট অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জমান ও ছাত্র উপদেষ্টা ওবায়দুল ইসলাম। ফ্যাকাল্টি বিল্ডিংয়ের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. রহিম উল্ল্যাহ, বিভাগ থেকে ছিলেন সহকারী অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান।
এই ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে শাস্তি দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থী শিক্ষক সংগঠন গ্রীণ ফোরাম, জিয়া পরিষদ শিক্ষক ইউনিট ও ইউট্যাব। এছাড়া ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র ইউনিয়ন, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত ছাত্রমজলিশসহ অন্যান্য সংগঠনও বিবৃতি দিয়েছে।
১৮৬ বার পড়া হয়েছে