বাতাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব নেই আমাদের, কিন্তু ধুলোর সঙ্গে সহাবস্থান আছে-
শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৬:২৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
শহরের সকাল একসময় ছিল আলোর মতো স্বচ্ছ। জানালা খুললেই ভোরের বাতাস এসে ছুঁয়ে দিত মুখ। সেই বাতাসে থাকত ঘাসের গন্ধ, ভেজা মাটির নরম সুর, দূরের কোনো পাখির ডানার শব্দ।
এখন জানালা খুললেই যে বাতাস আসে, তার সঙ্গে থাকে ধূসর এক অস্বস্তি। আলো আসে ঠিকই, কিন্তু আলোকে ঘিরে থাকে ধুলোর আবরণ।
আমরা কি খেয়াল করেছি—শহরে এখন বাতাসের কোনো নিজস্ব গন্ধ নেই?
সে কেবল বহন করে ধুলা, ধোঁয়া আর অবহেলার চিহ্ন।
একটি গাড়ি যায়, আর তার পিছু নেয় ধুলোর ঝড়। মোটরসাইকেলের চাকা ঘুরে উঠলে বাতাসে ভেসে ওঠে সূক্ষ্ম কণার অদৃশ্য বাহিনী। আমরা হাঁটি, কথা বলি, বাজারে যাই, অফিসে যাই—আর প্রতিটি শ্বাসে জমা করি সামান্য করে বিষ। ধুলা এখন কেবল রাস্তায় নেই; ধুলা আছে আমাদের ফুসফুসে, আমাদের রক্তে, আমাদের প্রতিদিনের ক্লান্তিতে।
এটাই কি উন্নয়ন? রাস্তা হয়েছে পাকা, অট্টালিকা হয়েছে উঁচু, যানবাহন বেড়েছে, কিন্তু আমাদের স্বস্তির জায়গা কমেছে।
শহরের অলিগলি আজ যেন এক অবিরাম নির্মাণস্থল। কোথাও ড্রেন খোঁড়া, কোথাও পাইপ বসানো, কোথাও নতুন ভবনের ভিত্তি। উন্নয়নের এই দৃশ্যের মধ্যে একটি জিনিস প্রায় অদৃশ্য—পরিচ্ছন্নতার শৃঙ্খলা।
নির্মাণকাজের পাশে নেই সুরক্ষা আবরণ, নেই নিয়মিত পানি ছিটানো। খোলা মাটিতে চাকা ঘুরলেই বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আর সেই ভার বহন করে আমাদের শরীর। অদ্ভুতভাবে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
নাকে রুমাল চেপে ধরা এখন স্বাভাবিক দৃশ্য। শিশুর কাশি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমরা তাকে মৌসুমি বলে পাশ কাটাই। বয়স্ক মানুষের শ্বাসকষ্টকে বয়সের দোষ বলে মেনে নিই।
এভাবেই আমাদের সহাবস্থান গড়ে ওঠে—
প্রথমে অস্বস্তি, তারপর সহনশীলতা, সব শেষে নীরবে গ্রহণ।
একসময় এই আমাদের চলাচল ছিল ধীর, কিন্তু নির্মল। নদীপথে যাত্রা মানে ছিল বাতাসের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা। আগে বাড়ির সামনে পরিবেশ বান্ধব নৌকা। কিন্তু এখন থেকে জ্বালানি উৎপাদন ব্যবহৃত ইঞ্জিনের বাহন। এখন সেই খাল-বিল নদী-নালা নেই। বদ্ধ জলাশয়গুলোও ভরাট হচ্ছে প্রতিদিন। হারিয়ে যাচ্ছে পানির উৎস।
অতীতে ধুলোর ঝড় নয়, বরং খোলা আকাশের স্বচ্ছতা ছিল আমাদের সঙ্গী। উন্নয়ন কম ছিল, কিন্তু শ্বাস-প্রশ্বাসে ছিল নিশ্চিন্ততা। আজ উন্নয়ন বেশি, কিন্তু আমরা মুখে মাস্ক পরে বাঁচতে শিখছি।
তাহলে কি সমাধান অতীতে ফিরে যাওয়া ? না, অতীত ইতিহাসে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। আর প্রয়োজনও নেই। আমাদের দরকার অতীতের নির্মলতা আর বর্তমানের প্রযুক্তির সুশৃঙ্খল সমন্বয়।
উন্নয়ন যদি পরিকল্পিত হয়, তবে এক বিন্দুও ধুলা থাকার কথা নয়। নিয়মিত রাস্তা ধোয়া, নির্মাণকাজে সুরক্ষা জাল, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার, নগর বৃক্ষরোপণ—এসব কোনো বিলাসিতা নয়; নাগরিক অধিকার। পৌরসভা ও প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য।
হ্যাঁ-- প্রতিদিনই শহরের সড়ক থেকে অবাঞ্ছিত কাগজ পত্র সহ খড়-কুটো তুলে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু থেকেই যাচ্ছে মানবদেহের সবচেয়ে ক্ষতিকর ধুলা। যা বাতাসের সঙ্গে আমাদের দেহে প্রবেশ করছে প্রতিনিয়ত। আর আমরা ধীরে ধীরে ক্ষতির মুখে ধাবিত হচ্ছি।
পৌরসভা / শহর শুধু কর আদায়ের ক্ষেত্র নয়, এটির দায়িত্ব নাগরিকের জন্য নির্মল পরিবেশ তৈরি করাও। উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য কেবল ফিতাকাটা দিয়ে মাপা যাবে না, তা মাপা উচিত বাতাসের মানদণ্ডে।
একটি শহর তখনই সত্যিকারের উন্নত, যখন তার নাগরিকেরা গভীর শ্বাস নিতে পারে নির্ভয়ে। তবে দায় কেবল প্রশাসনের নয়। নাগরিক হিসেবেও আমাদের ভূমিকা আছে।
আমরা যদি ধুলোর সঙ্গে সহাবস্থানকে অনিবার্য মনে করি, তবে পরিবর্তনের দাবি দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি প্রশ্ন তুলি— কেন আমাদের বাতাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব নেই ? আর সেই প্রশ্নই হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তনের সূচনা।
কারণ শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন কেবল কংক্রিটের গাঁথুনি নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনের মান। একটি জাতির অগ্রগতি কেবল সড়কের দৈর্ঘ্যে নয়, নাগরিকের শ্বাসের স্বস্তিতে মাপা হয়।
কিন্তু আজকের চরম বাস্তবতা এই যে—
আমাদের বাতাসের সঙ্গে বন্ধুত্ব নেই, কিন্তু ধুলোর সঙ্গে সহাবস্থান আছে।
আমাদের দূর ভবিষ্যৎ কি এমনই থাকবে? আমরা কি ধুলোর সঙ্গে আপস করেই যাব, নাকি বাতাসের সঙ্গে পুনরায় বন্ধুত্ব গড়ার সাহস দেখাব?
তবে সময়ের দাবি স্পষ্ট— ধুলাকে নিয়ন্ত্রণে আনা, নির্মল বাতাসকে ফিরিয়ে আনা, আর শহরকে বাসযোগ্য করা।
(লেখাটি লেখকের ফেসবুক পেইজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)
১২২ বার পড়া হয়েছে